কেশবপুরে পরিত্যক্ত বিদ্যালয়, খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করছে শিক্ষার্থীরা
ইমরান হোসেন, (যশোর) মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত সাগরদাঁড়ী মধুপল্লী। সাহিত্য ও ইতিহাসের টানে প্রতিদিন সেখানে ছুটে আসেন দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী এই জনপদেই রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে খোলা আকাশের নিচে শিক্ষা গ্রহণ করতে হচ্ছে কোমলমতি শিশুদের। ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ও ১৯৯৩ সালে পুনর্নির্মিত সাগরদাঁড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় প্রায় এক বছর আগে তা পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও তৈরি করা হয়নি কোনো বিকল্প শ্রেণিকক্ষ বা অস্থায়ী শেড। ফলে বাধ্য হয়ে কখনো গাছতলায়, কখনো ফুটপাতে, আবার কখনো অন্যের ভবনের বারান্দায় পলিথিন টাঙিয়ে চলছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মূল ভবনটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছিল কর্তৃপক্ষ। তবে দীর্ঘদিনেও বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না করায় রোদ-বৃষ্টির মধ্যেই গাছের নিচে বা ফুটপাতে ক্লাস নিতে হচ্ছে শিক্ষকদের।
এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে শিশুরা। তীব্র রোদে ক্লাস করতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ছে। আবার হঠাৎ বৃষ্টি নামলে বই-খাতা নিয়ে ছুটতে হচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে; অনেক সময় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। দীর্ঘদিনের এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে বলে জানান শিক্ষকরা।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নন্দিনী রানী দাস তার আকুতি প্রকাশ করে বলে, “গাছতলায় বসে ক্লাস করার সময় রোদের তাপে মাথা ধরে যায়, খুব গরম লাগে। বৃষ্টি এলে বই-খাতা ভিজে যায়। অন্য স্কুলের শিক্ষার্থীরা সুন্দর ক্লাসরুমে বসে পড়াশোনা করলেও আমাদের ফুটপাতে বসতে হয়। আমরা একটা সুন্দর ও নিরাপদ ক্লাসরুম চাই।”
সন্তানদের নিরাপত্তা ও পড়াশোনার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরাও। তাদের অভিযোগ, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এভাবে খোলা আকাশের নিচে পড়ালেখা করানো শুধু চরম দুর্ভোগই নয়, এটি শিশুদের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মেহেরুন্নেসা বলেন, “ভবন পরিত্যক্ত হওয়ার পর শিশুদের নিরাপত্তাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাধ্য হয়ে গাছের নিচে কিংবা ফুটপাতে ক্লাস নিতে হচ্ছে। রোদ-বৃষ্টিতে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ায় উপস্থিতি দিন দিন কমে যাচ্ছে। অবিলম্বে অন্তত একটি অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা না করা গেলে বিদ্যালয় টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।”
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, “বিদ্যালয়ের ভবনটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাক্কলন তৈরি করে ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। দ্রুত প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।”
এদিকে সাগরদাঁড়ী মধুপল্লীর প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় বিদ্যালয়টি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার চিন্তাভাবনাও চলছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক পরিচালক মো. মহিদুল ইসলাম জানান, মধুপল্লীর সীমানার ভেতরে প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকায় শিশুদের খেলাধুলাসহ নানা ধরনের সমস্যা হচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে বিদ্যালয়টি সুবিধাজনক স্থানে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
তবে স্থানান্তর কিংবা নতুন ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া কবে নাগাদ শেষ হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। সচেতন মহলের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা যাই হোক না কেন, শিশুদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকে রক্ষা করতে জরুরি ভিত্তিতে এখনই একটি অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি।

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬
কেশবপুরে পরিত্যক্ত বিদ্যালয়, খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করছে শিক্ষার্থীরা
ইমরান হোসেন, (যশোর) মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত সাগরদাঁড়ী মধুপল্লী। সাহিত্য ও ইতিহাসের টানে প্রতিদিন সেখানে ছুটে আসেন দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী এই জনপদেই রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে খোলা আকাশের নিচে শিক্ষা গ্রহণ করতে হচ্ছে কোমলমতি শিশুদের। ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ও ১৯৯৩ সালে পুনর্নির্মিত সাগরদাঁড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় প্রায় এক বছর আগে তা পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও তৈরি করা হয়নি কোনো বিকল্প শ্রেণিকক্ষ বা অস্থায়ী শেড। ফলে বাধ্য হয়ে কখনো গাছতলায়, কখনো ফুটপাতে, আবার কখনো অন্যের ভবনের বারান্দায় পলিথিন টাঙিয়ে চলছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মূল ভবনটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছিল কর্তৃপক্ষ। তবে দীর্ঘদিনেও বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না করায় রোদ-বৃষ্টির মধ্যেই গাছের নিচে বা ফুটপাতে ক্লাস নিতে হচ্ছে শিক্ষকদের।
এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে শিশুরা। তীব্র রোদে ক্লাস করতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ছে। আবার হঠাৎ বৃষ্টি নামলে বই-খাতা নিয়ে ছুটতে হচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে; অনেক সময় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। দীর্ঘদিনের এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে বলে জানান শিক্ষকরা।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নন্দিনী রানী দাস তার আকুতি প্রকাশ করে বলে, “গাছতলায় বসে ক্লাস করার সময় রোদের তাপে মাথা ধরে যায়, খুব গরম লাগে। বৃষ্টি এলে বই-খাতা ভিজে যায়। অন্য স্কুলের শিক্ষার্থীরা সুন্দর ক্লাসরুমে বসে পড়াশোনা করলেও আমাদের ফুটপাতে বসতে হয়। আমরা একটা সুন্দর ও নিরাপদ ক্লাসরুম চাই।”
সন্তানদের নিরাপত্তা ও পড়াশোনার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরাও। তাদের অভিযোগ, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এভাবে খোলা আকাশের নিচে পড়ালেখা করানো শুধু চরম দুর্ভোগই নয়, এটি শিশুদের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মেহেরুন্নেসা বলেন, “ভবন পরিত্যক্ত হওয়ার পর শিশুদের নিরাপত্তাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাধ্য হয়ে গাছের নিচে কিংবা ফুটপাতে ক্লাস নিতে হচ্ছে। রোদ-বৃষ্টিতে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ায় উপস্থিতি দিন দিন কমে যাচ্ছে। অবিলম্বে অন্তত একটি অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা না করা গেলে বিদ্যালয় টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।”
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, “বিদ্যালয়ের ভবনটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাক্কলন তৈরি করে ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। দ্রুত প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।”
এদিকে সাগরদাঁড়ী মধুপল্লীর প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় বিদ্যালয়টি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার চিন্তাভাবনাও চলছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক পরিচালক মো. মহিদুল ইসলাম জানান, মধুপল্লীর সীমানার ভেতরে প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকায় শিশুদের খেলাধুলাসহ নানা ধরনের সমস্যা হচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে বিদ্যালয়টি সুবিধাজনক স্থানে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
তবে স্থানান্তর কিংবা নতুন ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া কবে নাগাদ শেষ হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। সচেতন মহলের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা যাই হোক না কেন, শিশুদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকে রক্ষা করতে জরুরি ভিত্তিতে এখনই একটি অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি।

আপনার মতামত লিখুন