মোঃ রাসেল আহমেদ , মদন নেত্রকোনা প্রতিনিধি ||
নেত্রকোণার মদনে বিদ্যালয় ভবন রক্ষা প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগমোঃ রাসেল আহমেদ মদন (নেত্রকোণা) প্রতিনিধি:-নেত্রকোণার মদন উপজেলার তিয়শ্রী ইউনিয়নের বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বাস্তবায়নাধীন জরুরি ভাঙন রোধ প্রকল্পের কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ঠিকাদার ও প্রকল্পের তদারকি কর্মকর্তা পাউবোর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মুস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন হোসাইন কবির নামে এক ব্যক্তি।গত ২০ সেপ্টেম্বর দায়ের করা ওই অভিযোগে প্রকল্পের প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ না করার পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রীর মান ও ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে।অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মগড়া নদীর ভাঙন থেকে বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রক্ষায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১৯ লাখ ৮২ হাজার ২৮২ টাকা ব্যয়ে ৮০ মিটার এলাকায় জরুরি ভাঙন রোধ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রাক্কলন অনুযায়ী ১২ মিটার লম্বা ১৩টি শক্ত কাঠের বল্লা, ৮০ মিটার দৈর্ঘ্যে কমপক্ষে ৩৯টি ব্যারাক বাঁশের পাইলিং, ওয়ালিং পিস ২০ মি.মি. নাট-বল্টু দিয়ে সংযুক্ত করা, ২৫০ কেজি ওজনের ৩ হাজার ১২৫টি জিও-ব্যাগে শুকনো বালু ডাম্পিং এবং ১৭৫ কেজি ওজনের ১ হাজার ২১০টি শুকনো বালুর জিও-ব্যাগ প্লেসিং করার কথা রয়েছে। জিও-ব্যাগের বালু ওজন করে নিশ্চিত করার বিষয়টিও প্রাক্কলনে উল্লেখ রয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।তবে অভিযোগকারীর দাবি, প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ না করে ঠিকাদার নিজস্বভাবে কাজ করেছেন। শুকনো বালুর পরিবর্তে ভেজা বালু ব্যবহার, শক্ত কাঠের বল্লার পরিবর্তে মেহগনি গাছের ডাল ব্যবহারসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। প্রকল্পের তদারকি কর্মকর্তা মুস্তাফিজুর রহমানের সহযোগিতায় এসব অনিয়ম করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।স্থানীয়দের কয়েকজন জানান, কাজ চলাকালে অনিয়মের অভিযোগ তুলে স্থানীয় ইউপি সদস্যের উপস্থিতিতে একপর্যায়ে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরে আবার কাজ শুরু করে ঠিকাদার প্রকল্পের কাজ শেষ করেন বলে তারা জানান।গত ৭ অক্টোবর সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদীভাঙন রোধ প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। তবে প্রকল্পের কাজের ধরন ও ব্যবহৃত উপকরণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।বাগজান গ্রামের আশরাফুল ইসলাম আকন্দ বলেন, “স্কুল রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প দেওয়ার খবর শুনে আমরা খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু ঠিকাদার এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি ও স্কুল কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে কাজ শুরু করেন। প্রাক্কলনে কী রয়েছে, সেটিও কাউকে জানতে দেওয়া হয়নি। আমরা চাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্ত করে দেখুক। অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”একই গ্রামের পুতুল মিয়া বলেন, “কাজে কী করা হয়েছে তা এখন অনেকটাই দেখা যাচ্ছে। পানি কমে যাওয়ায় প্রকল্পের কাজের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত করা প্রয়োজন।”তিয়শ্রী ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল্লাহ বলেন, “ঠিকাদার একদিন আমাকে ডেকে একটি বালুর বস্তা ওজন করে দেখিয়েছিলেন। সেখানে প্রায় ২৮০ কেজি বালু ছিল। তবে জিও-ব্যাগে ভেজা বালু দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের প্রাক্কলনে কী কী রয়েছে, তা আমি জানি না।”অভিযোগকারী হোসাইন কবির বলেন, “বাগজান স্কুল রক্ষা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে আমি মনে করি। ঠিকাদারকে প্রকল্পের তদারকি কর্মকর্তার সহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঠিকাদারের প্রতিনিধি উজ্জ্বল তালুকদার। তিনি বলেন, “পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জানানো হয়েছে, জেলা প্রশাসক স্যার অভিযোগ পাওয়ার পর তাদের ডেকেছেন। তবে আমরা কাজে কোনো অনিয়ম করিনি।”পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, “কোনো প্রকল্প দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী স্যারের বক্তব্য নিতে পারেন।”বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাদেকুর রহমান বলেন, “বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের পর ঠিকাদার বালুভর্তি জিও-ব্যাগ নদীতে ফেলার সময় আমাকে বা পিয়নকে ডেকে নিয়েছেন। তবে এর আগে বল্লাসহ যেসব উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো পরিবর্তন করা হয়নি। জিও-ব্যাগে ভেজা বালু দেওয়া হয়েছে। কয়েকদিন হলো কাজ শেষ হয়েছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকল্পের প্রাক্কলন সম্পর্কে আমাদের কিছু জানানো হয়নি।”এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।নেত্রকোণার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, “মদন উপজেলার বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নদীভাঙন রোধ প্রকল্পে অনিয়মের একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে বলা হয়েছে।”এদিকে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত হলে প্রকল্পের প্রাক্কলন, ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর পরিমাণ ও মান, জিও-ব্যাগের ওজন এবং বাস্তবায়নকাজ সরেজমিনে যাচাই করে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।