সিরাজুল কবির বুলবুল , উখিয়া, কক্সবাজার ||
বাংলাদেশ মায়ানমারে সীমান্তবর্তী থানা উখিয়া, রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে অপরাধ জগতের ঘটনা ঘটছে এখানে প্রতিনিয়ত। উখিয়া থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদারের উখিয়া থানায় যোগদানের পর থেকে শুরু হয়েছে ব্যাপক ভাবে অপরাধ নিধন অভিযান। তারই প্রেক্ষিতে গত ৯০দিনের দুর্দান্ত সাহসী কিছু অভিযান পরিচালনা করেন উখিয়া থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার। এর পর থেকে তিনি চলে আসেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। গত ৯০ দিনে ৬০৪ জন আসামী গ্রেফতার, ৬৩ ভিকটিম উদ্ধার করতে সমর্থ হয়েছেন উখিয়া থানা,এ ছাড়াও ৩ লাখ ৩১ হাজার ৮৬৮ পিস ইয়াবা জব্দ, উদ্ধার আগ্নেয়াস্ত্র-গুলি; আটক ৬৭ কিশোর গ্যাং সদস্য।কক্সবাজারের উখিয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার এবং অপরাধ দমনে গত ৯০ দিনে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছে উখিয়া থানা পুলিশ। ২০২৬ সালের ১ আগস্ট থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে ৬০৪ জনকে গ্রেপ্তার ও আটক করা হয়েছে। এ সময়ে ৩ লাখ ৩১ হাজার ৮৬৮ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য, আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি অপহরণ মামলা ও নিখোঁজ ডায়েরির ভিত্তিতে ৬৩ জন ভিকটিমকে উদ্ধার করেছে পুলিশ।উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আতিকুর রহমান মজুমদারের নেতৃত্বে পরিচালিত এসব অভিযানে মাদক কারবারি, পরোয়ানাভুক্ত আসামি, নিয়মিত মামলার আসামি ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে থানা সূত্রে জানা গেছে।উখিয়া থানা পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে ৬১ জন মাদক ব্যবসায়ী, গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত ২৩৯ জন এবং নিয়মিত মামলায় ১৮৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় দুজন, ১৫১ ধারায় ১২ জন এবং দণ্ডবিধির ২৯০ ধারায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে আরও ৩২ জনকে।পুলিশের চলমান অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের ৬৭ সদস্যকেও আটক করা হয়েছে।আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে, মাদক কারবার ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান, অপরাধীদের শনাক্তকরণ এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অপহৃত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে গত তিন মাসে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের তথ্য জানিয়েছে উখিয়া থানা পুলিশ।পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১০টি শিশু অপহরণ মামলায় ১১ জন এবং চারটি ব্যক্তি অপহরণ মামলায় ছয়জন ভিকটিমকে উদ্ধার করা হয়েছে। অর্থাৎ, ১৪টি অপহরণ মামলায় মোট ১৭ জন ভিকটিম উদ্ধার হয়েছেন।এ ছাড়া নিখোঁজ ডায়েরির ভিত্তিতে আরও ৪৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে অপহরণ মামলা ও নিখোঁজ ডায়েরির সূত্রে উদ্ধার করা হয়েছে ৬৩ জনকে।অপহরণের শিকার শিশু ও অন্যান্য ব্যক্তিদের উদ্ধার এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে পুলিশের এ কার্যক্রম জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।গত ৯০ দিনের অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করেছে পুলিশ। উদ্ধার করা মাদকের মধ্যে রয়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার ৮৬৮ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ১১৮ দশমিক ৫ লিটার দেশীয় তৈরি চোলাই মদ এবং তিন কেজি গাঁজা।এ ছাড়া একটি পিস্তল, একটি ওয়ান শুটার গান, একটি একনলা বন্দুক, একটি ম্যাগাজিন, পাঁচ রাউন্ড গুলি ও একটি ছোরা উদ্ধার করা হয়েছে।মাদক ও অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে চারটি টমটম, একটি সিএনজি ও তিনটি মোবাইল ফোনও জব্দ করা হয়। পাশাপাশি চোরাচালানবিরোধী অভিযানে ৫৪ বস্তা সার ও ২ হাজার পিস ইনজেকশন উদ্ধার করেছে পুলিশ।বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা উখিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযান জোরদারের বিষয়টি সামনে এনেছে। তবে মাদক সরবরাহের উৎস ও এর সঙ্গে জড়িত মূল চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সচেতন মহল।উখিয়া থানা পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে থানায় ২৬৩টি জিআর মামলা রুজু হয়েছে। একই সময়ে ২৫৭টি জিআর মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে।পুলিশের ভাষ্য, অপরাধ দমন, মাদকবিরোধী অভিযান, পরোয়ানাভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার, অপহৃত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধার এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, উখিয়া থানা এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, মাদকদ্রব্যের বিস্তার রোধ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। গত তিন মাসে পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে মাদকদ্রব্য ও অস্ত্র উদ্ধার, আসামি গ্রেপ্তার এবং অপহরণ ও নিখোঁজের ঘটনায় ভিকটিম উদ্ধারে পুলিশ সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে।তিনি আরও বলেন, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধপ্রবণতা সমাজের জন্য বড় হুমকি। তরুণ প্রজন্মকে অপরাধ থেকে দূরে রাখা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। অপহরণ, মাদক কারবার, অবৈধ অস্ত্র কিংবা অন্য যেকোনো অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধী যে-ই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।ওসি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। কোনো এলাকায় মাদক কারবার, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, অপহরণ কিংবা অন্য কোনো অপরাধের তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত পুলিশকে জানানোর জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।সংশ্লিষ্টদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি মাদক পাচারের উৎস শনাক্ত, অপরাধী চক্রের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া রোধে কার্যকর সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত ভূমিকা থাকলে অপরাধ প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া সম্ভব।উখিয়া থানা পুলিশের গত ৯০ দিনের কার্যক্রমে আসামি গ্রেপ্তার, মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার এবং অপহৃত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারের তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের চলমান তৎপরতার চিত্র তুলে ধরেছে।