মোমেন আকন্দ , (গাজীপুর) ||
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতির নানা সূচকেও পরিবর্তন এসেছে। বৈদেশিক ঋণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ঋণ পরিশোধ, রেমিট্যান্স ও মূল্যস্ফীতির মতো বিষয়গুলো একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।তাই আবেগ নয়, বরং পরিসংখ্যানের দিকে তাকিয়েই বর্তমান সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা উচিত। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর বাংলাদেশের চিত্র ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে এবং ৬ জানুয়ারি ২০০৯ সরকার গঠন করে।সে সময় বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ ছিল প্রায় ২৩.৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৬.১৫ বিলিয়ন ডলার।৫ আগস্ট ২০২৪: হাসিনা সরকারের পতনের সময় দীর্ঘ সময় পর ৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।সে সময় বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়ায় প্রায় ১০৪.৪৯ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে IMF-এর BPM6 পদ্ধতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ২০.৪৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ২০০৮ সালের তুলনায় বৈদেশিক ঋণ যেমন অনেক বেড়েছে, তেমনি রিজার্ভও বেড়েছে তবে ঋণের বৃদ্ধির হার ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।ইউনূস সরকারের সময় ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে।বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১১৩.৫২ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার।তারেক রহমান সরকারের যাত্রা ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় IMF-এর BPM6 পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল প্রায় ২৯.৮৫ বিলিয়ন ডলার।এরপর রিজার্ভে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়। জুন ২০২৬ শেষে গ্রস রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭.৫৮ বিলিয়ন ডলারে। সর্বশেষ উল্লেখিত হিসাবে রিজার্ভ রয়েছে প্রায় ৩৬.৪ বিলিয়ন ডলার।বৈদেশিক ঋণ পরিশোধেও বড় অঙ্ক শুধু রিজার্ভ বাড়ানো নয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছে সরকার। মার্চ থেকে জুলাই ২০২৬ এই পাঁচ মাসে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ মিলিয়ে প্রায় ২.০৪৭৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে।এর মধ্যে • ঋণের আসল: ১৩৫.২৪ কোটি ডলার • সুদ: ৬৯.৫২ কোটি ডলার • মোট: ২০৪.৭৬ কোটি ডলার অর্থাৎ মাত্র পাঁচ মাসেই বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ বাবদ ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি পরিশোধ করা হয়েছে।রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক খাতে ইতিবাচক চিত্র এপ্রিল–জুন ২০২৬ সময়ে দেশে প্রায় ৯.৩৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।একই সময়ে FY2026-এ বাংলাদেশের Balance of Payments surplus হয়েছে প্রায় ৬.৬১ বিলিয়ন ডলার।বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ ও রেমিট্যান্সের এই চিত্র অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা যেতে পারে।মূল্যস্ফীতিতেও কিছুটা স্বস্তি মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। তবে জুন ২০২৬-এ সাধারণ মূল্যস্ফীতি নেমে আসে ৯.১৬ শতাংশে। মে মাসে যা ছিল ৯.৪২ শতাংশ। FY2026-এর গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৬৮ শতাংশ, যেখানে আগের অর্থবছরে তা ছিল ১০.০৩ শতাংশ।কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় উদ্যোগ সরকারি ১৮০ দিনের মূল্যায়ন অনুযায়ী ১৪.৩৪ লাখ কৃষকের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। এছাড়া সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত ২৪ লাখ টনের বেশি হয়েছে বলে সরকার জানিয়েছে।সামাজিক নিরাপত্তায় উদ্যোগ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৬৭ লাখের বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার মাসে ৩০ টাকা কেজি দরে চাল পাচ্ছে। পাশাপাশি Family Card ও Farmer Card-এর পাইলট কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে পদক্ষেপ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও Net Metering-এর মাধ্যমে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য পূরণ হয়েছে বলে সরকারি মূল্যায়নে বলা হয়েছে।এছাড়া গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ১৫০টি কূপ খনন/ওয়ার্কওভারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩০টি কাজ শেষ করে দৈনিক প্রায় ১৪০ MMcf গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন।এক নজরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিত্র সময় বৈদেশিক ঋণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০০৮–০৯ $২৩.৩৫ বিলিয়ন $৬.১৫ বিলিয়ন৫ আগস্ট ২০২৪ $১০৪.৪৯ বিলিয়ন $২০.৪৮ বিলিয়ন*২০২৬ সালে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় $১১৩.৫২ বিলিয়ন ≈$৩৪ বিলিয়নজুন ২০২৬ $১১১.২৫ $৩৭.৫৮ বিলিয়নসর্বশেষ উল্লেখিত হিসাব — ≈$৩৬.৪ বিলিয়ন* IMF-এর BPM6 পদ্ধতির হিসাব।একটি সরকারের সাফল্য বিচার করতে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, অর্থনীতির বাস্তব পরিসংখ্যানও দেখতে হয়।রিজার্ভের পরিবর্তন, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ, রেমিট্যান্সের প্রবাহ, মূল্যস্ফীতি, কৃষি, খাদ্য মজুত ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো সূচকগুলো যদি ইতিবাচক দিকে এগোয়, তাহলে সেটিকে অবশ্যই স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।অবশ্যই সরকারের ভুল-ত্রুটি থাকলে তার সমালোচনা হবে। গণতন্ত্রে গঠনমূলক সমালোচনা প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে ইতিবাচক কাজের প্রশংসাও প্রয়োজন।দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি সরকারকে কাজ করার জন্য সময় দিতে হয়। তাই শুধু সমালোচনা নয়, ফলাফল দেখার অপেক্ষাও জরুরি।পরিসংখ্যান যখন আশার কথা বলে তখন সরকারের ওপর ভরসা রাখাই শ্রেয়। দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হোক, মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হোক এবং বাংলাদেশ এগিয়ে যাক এটাই হওয়া উচিত আমাদের সবার প্রত্যাশা।