মোঃ রিয়ায এলাহী রাজন: গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি : ||
দারিয়াপুরে পহেলা বৈশাখ: ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির এক প্রাণবন্ত মহোৎসবমোঃ রিয়ায এলাহী রাজন: গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি : বাংলা নববর্ষ ১ বৈশাখ বাঙালির জীবনে শুধু একটি ক্যালেন্ডার পরিবর্তনের দিন নয়; এটি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও চেতনার নবজাগরণের প্রতীক। সেই চেতনাকে ধারণ করেই গাইবান্ধা জেলার দারিয়াপুরে আজ মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হলো বর্ণাঢ্য পহেলা বৈশাখ উদযাপন। দারিয়াপুর সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে আয়োজিত এ দিনব্যাপী অনুষ্ঠান পরিণত হয় এক বিশাল জনসমাগম ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।সকাল ৯টায় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচির সূচনা হয়। উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনাব মোজাম্মেল হক সরকার। তাঁর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর দারিয়াপুরের স্থানীয় শিল্পীবৃন্দের পরিবেশনায় উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশিত হয়, যা নববর্ষের আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। এরপর মঙ্গল শোভাযাত্রা দারিয়াপুরের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে উৎসবকে সর্বজনীন রূপ দেয়।এ বছরের আয়োজনের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক ছিল ব্যাপক জনসমাগম। সকাল থেকেই দারিয়াপুরের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও আশপাশের গ্রাম থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হন। মানুষের ঢল এতটাই ছিল যে মাঠে দর্শকদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখা সম্ভব হয়নি এবং পুরো মাঠ ও আশপাশের এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। নারী, শিশু, তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানকে এক উৎসবমুখর জনসমাবেশে রূপ দেয়।অনুষ্ঠানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরিবেশনা। দারিয়াপুর কিয়ামত উল্লাহ মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনা দর্শকদের মন জয় করে নেয় এবং নবীন প্রজন্মের সংস্কৃতিচর্চার অগ্রগতি তুলে ধরে।সকাল সাড়ে ১১টায় অনুষ্ঠিত লোকজ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রাণচাঞ্চল্যকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে। এসব খেলাধুলা উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস ও আনন্দের সৃষ্টি করে।বিকেল ৩টায় শুরু হওয়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল পুরো দিনের মূল আকর্ষণ। বাউল গান, আবৃত্তি, নৃত্য ও নাট্য পরিবেশনার মাধ্যমে দারিয়াপুরের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যায়। আলোচনা সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন জনাব সফিউল আলম (সাবেক সভাপতি, সাংস্কৃতিক জোট, দারিয়াপুর)।তিনি নববর্ষের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এ ধরনের আয়োজন বাঙালির সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে আরও সমৃদ্ধ করে।সাংস্কৃতিক পর্বে অংশ নেন উদীচীসহ স্থানীয় ও আমন্ত্রিত শিল্পীবৃন্দ—মানিক লাল সরকার, আনিছুজ্জামান দুলু, সালমান খান, মোস্তাফিজ, রোকসানা রিতা, আনারুল ইসলাম, স্মৃতি সরকারসহ অনেকে। তাঁদের পরিবেশনা দর্শকদের গভীরভাবে মুগ্ধ করে এবং পুরো অনুষ্ঠানস্থলে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি করে।বাদ্যযন্ত্রে ছিলেন চন্ডীচরণ বর্মণ, তোজাম্মেল হক সরকার, জীতেন্দ্র নাথ সরকার, শৈলজানন্দ টুটন, কৃষ্ণ প্রামাণিক, খুশবু, স্বাধীন, মানিক বর্মন, আশিক, মিঠু প্রমুখ। তাঁদের নিপুণ বাদ্যযন্ত্র পরিবেশনা পুরো সাংস্কৃতিক পর্বকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।নৃত্য পরিবেশনা ও নাটক “আক্কেল সেলামী” এবং দারিয়াপুর পল্লীনাট্য সংস্থার যাত্রাপালার অংশ বিশেষ দর্শকদের দীর্ঘসময় ধরে আনন্দ দেয়। দিনব্যাপী এ আয়োজন দারিয়াপুরের সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের মধ্যে এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।সব মিলিয়ে দারিয়াপুরের পহেলা বৈশাখ উদযাপন ছিল এক বিশাল জনসমাগম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মিলনমেলা। বিপুল দর্শক উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, গ্রামীণ সমাজে এখনও সংস্কৃতি চর্চার প্রতি মানুষের গভীর আগ্রহ ও ভালোবাসা বিদ্যমান।