প্রিন্ট এর তারিখ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬
কেশবপুরে স্বাস্থ্যসেবার আড়ালে অনিয়ম: নিরব প্রশাসন নিয়ে প্রশ্ন
ইমরান হোসেন, যশোর জেলা প্রতিনিধি: ||
কেশবপুরে স্বাস্থ্যসেবার আড়ালে অনিয়ম: নিরব প্রশাসন নিয়ে প্রশ্নইমরান হোসেন, যশোর জেলা প্রতিনিধি: যশোরের কেশবপুর উপজেলায় বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম-দুর্নীতির এক অদৃশ্য জাল বিস্তার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার ২৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ২-৩টি ছাড়া অধিকাংশেরই লাইসেন্স নবায়ন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। তবুও রহস্যজনকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ‘ম্যানেজ’ করে এসব প্রতিষ্ঠান নির্বিঘ্নে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, কেশবপুর সরকারি হাসপাতালের চারপাশে গড়ে উঠেছে ২৩টি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে ১৪টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। মনোয়ারা, হিরা, পিয়ারলেস, নিউরাইজিং, শার্লী ও সেবা প্যাথলজি সেন্টারসহ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে একই রোগের পরীক্ষায় ভিন্ন ভিন্ন রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এতে রোগীরা যেমন বিভ্রান্ত হচ্ছেন, তেমনি ভুল চিকিৎসা ও অতিরিক্ত অর্থব্যয়ের শিকার হচ্ছেন।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেই মানসম্মত ল্যাব সুবিধা, নেই প্রশিক্ষিত ও সনদধারী টেকনোলজিস্ট। ফলে পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। চিকিৎসা সেবার নামে এক প্রকার ‘নীরব প্রতারণা’।উপজেলায় ৯টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মধ্যে কেশবপুর শিশু ও জেনারেল হাসপাতাল ইতোমধ্যে জনরোষের মুখে প্রশাসন বন্ধ করে দিয়েছে। কেশবপুর সার্জিক্যাল ক্লিনিক ও হোসেন ক্লিনিকসহ ২-৩টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন থাকলেও মাইকেল হাসপাতাল, মাতৃমঙ্গল ক্লিনিক, কপোতাক্ষ সার্জিক্যাল ক্লিনিক ও মডার্ন হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে।অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ ক্লিনিকে মানসম্মত অপারেশন থিয়েটার, অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত নার্সের অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্থান থেকে অনকলে অদক্ষ বা অপরিচিত চিকিৎসক এনে অপারেশনসহ চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে, যা রোগীদের জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।বিশেষ করে মডার্ন হাসপাতালের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগীদের দেওয়া প্যাথলজি ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্টে চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করা হলেও সীল-স্বাক্ষরবিহীন রিপোর্ট সরবরাহ করা হচ্ছে—যা স্পষ্টতই আইন ও নৈতিকতার পরিপন্থী। অথচ নানা অভিযোগে একাধিকবার বন্ধ হওয়ার পরও রহস্যজনকভাবে প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালু হয়েছে।এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রেহেনেয়াজ জানান, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই, তবে তারা আবেদন করেছে। কিছু প্রতিষ্ঠানে কাগজপত্রের ঘাটতি থাকায় নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে তার বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব চিত্রের অসঙ্গতি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।স্বাস্থ্যসেবার মতো সংবেদনশীল খাত যদি নিয়ন্ত্রণহীন ও জবাবদিহিতাবিহীন হয়ে পড়ে, তবে তা সরাসরি মানুষের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। কেশবপুরে যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা কেবল অনিয়ম নয়—এটি জনস্বাস্থ্যের প্রতি এক ধরনের চরম অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার বহিঃপ্রকাশ। সংশ্লিষ্টদের নীরবতা ও দায়সারা মনোভাব এই অনিয়মকে আরও উৎসাহিত করছে।উপজেলাবাসী দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানকে কঠোরভাবে পরিদর্শন, অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় স্বাস্থ্যসেবার নামে এই ‘অনিয়মের ব্যবসা’ আরও ভয়াবহ রূপ নেবে বলে আশঙ্কা করছেন কেশবপুর পৌর বাড়ি মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ ও কেশবপুর উপজেলার সুধী সমাজ। অন্যথায় কোনোমতে এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবে বলেও জানিয়েছেন তারা।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ডেইলি সংবাদ