সুমন আহমদ, দোয়ারাবাজার, সুনামগঞ্জ। ||
রোদ ওঠায় কাটছে শঙ্কা সুনামগঞ্জে ধান কাটার উৎসবের আমেজ।সুমন আহমদ, দোয়ারাবাজার, সুনামগঞ্জ। সুনামগঞ্জের দিগন্তজোড়া হাওরগুলোতে এখন বইছে আনন্দ আর কর্মব্যস্ততার ঢেউ। গত কয়েক দিনের মেঘলা আকাশ আর বৃষ্টির শঙ্কা কাটিয়ে কাঙ্ক্ষিত রোদের দেখা মেলায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন এ অঞ্চলের লাখো কৃষক। বোরো ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজে এখন মহাব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। জেলার প্রতিটি হাওর এখন সোনালী ধানের গন্ধে মৌ মৌ করছে, যা রূপ নিয়েছে এক চিরায়ত উৎসবের আমেজে।সুনামগঞ্জ মূলত একটি ফসলনির্ভর জেলা।এখানকার মানুষের সারা বছরের আহার ও উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম বোরো ধান। কয়েক দিন ধরে আকাশে মেঘের ঘনঘটা আর আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কায় কৃষকদের চোখে ঘুম ছিল না। পাকা ধান অনেকে তলিয়ে নিয়ে বন্যায় এখন যা পাকা ধান রয়েছে মাঠ থেকে ঘরে তোলা যাবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছিল তীব্র অনিশ্চয়তা। কিন্তু আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাসকে স্বস্তি দিয়ে আকাশ পরিষ্কার হয়ে ঝলমলে রোদের দেখা মেলায় দৃশ্যপট বদলে গেছে। কড়া রোদের ফলে ধান দ্রুত শুকানো এবং খড় সংরক্ষণে ব্যাপক সুবিধা হচ্ছে।বিভিন্ন উপজেলায় বড় বড় হাওর যেমন তাহিরপুরের শনি ও মাটিয়ান হাওর, ধর্মপাশার জয়ধনা ও সোনামোড়ল হাওর, শাল্লার ছায়ার হাওর এবং দিরাইয়ের বরাম হাওরসহ ছোট-বড় সব হাওরে এখন ধান কাটার মহোৎসব চলছে। স্থানীয় কৃষকদের পাশাপাশি সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও কুড়িগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা কয়েক হাজার মৌসুমি শ্রমিক ধান কাটায় অংশ নিচ্ছেন। শ্রমিকদের পাশাপাশি কৃষি বিভাগের সরবরাহ করা কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার মেশিন দিয়েও দ্রুত ধান কাটার কাজ চলছে।সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, হাওরের উঁচু জায়গা বা খলাগুলোতে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ধান মাড়াই, ওড়ানো ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও। একদিকে চলছে কাঁচা ধানের স্তূপ সাজানো, অন্যদিকে প্রখর রোদে ধান শুকিয়ে গোলায় তোলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি।কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জে ধানের ফলন বিগত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক ভালো হয়েছে। কিন্তু অনেকের বোরো ধান তলিয়ে গেছে। রোগবালাইয়ের আক্রমণ কম থাকায় ও সঠিক সময়ে সার-বীজ পাওয়ায় ফলন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে বাজারে ধানের দামও বেশ ভালো। যদি আবহাওয়া আর কয়েকটা দিন এমন স্থির থাকে এবং বাজারে ন্যায্য দাম বজায় থাকে, তবে কৃষকরা তাদের সারা বছরের কষ্ট সার্থক হয়েছে বলে মনে করবেন।হঠাৎ আগাম বন্যা বা পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকি এড়াতে জেলা প্রশাসন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কৃষকদের ধান ৮০ শতাংশ পেকে গেলেই দ্রুত কেটে ফেলার জন্য নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে নিচু এলাকার ধানগুলো আগে কাটার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া হাওরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বাঁধগুলোর ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। সুনামগঞ্জের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার মূল চালিকাশক্তি এই বোরো ফসল। সোনালী ধানের এই হাসিতেই লুকিয়ে থাকে প্রান্তিক মানুষের স্বপ্ন। রোদেলা আবহাওয়ার এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে জেলার সিংহভাগ ধান নিরাপদ স্থানে পৌঁছে যাবে বলে কৃষকরা প্রত্যাশা করছেন। হাওরের এই সোনালী উৎসব যেন নির্বিঘ্নে শেষ হয়, এখন এটিই সুনামগঞ্জবাসীর প্রধান প্রার্থনা।