মোঃ রিয়ায এলাহী রাজন:গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি: ||
গাইবান্ধায় দুদকের গণশুনানি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তা, জনভোগান্তি নিরসনে তাৎক্ষণিক উদ্যোগমোঃ রিয়ায এলাহী রাজন:গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি: “সবাই মিলে গড়বো দেশ, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ”— এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে গাইবান্ধায় অনুষ্ঠিত হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গণশুনানি। জনসেবায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আয়োজিত এ গণশুনানি পরিণত হয় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, অভিযোগ ও দীর্ঘদিনের ভোগান্তির একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মে।সোমবার গাইবান্ধা জেলা ইনডোর স্টেডিয়ামে দিনব্যাপী এ গণশুনানির আয়োজন করে দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বিত রংপুর জেলা কার্যালয়। এতে সহযোগিতা করে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসন ও জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি। সকাল ১০টায় শুরু হওয়া গণশুনানি বিকেল পর্যন্ত চলে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আগত ভুক্তভোগী মানুষ সরাসরি তাদের অভিযোগ, হয়রানি ও সেবা বঞ্চনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে।গণশুনানিতে উঠে আসে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে সেবা পেতে ঘুষ দাবি, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, ফাইল আটকে রাখা, দায়িত্বে অবহেলা, দীর্ঘসূত্রিতা, অনিয়ম ও প্রশাসনিক জটিলতার মতো নানা অভিযোগ। অনেকেই অভিযোগ করেন, সাধারণ মানুষ সেবা নিতে গিয়ে নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন এবং নির্ধারিত সময়েও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। এসময় অনেক ভুক্তভোগী আবেগাপ্লুত হয়ে তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ গণশুনানিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দুদকের মহাপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন এবং মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি এম এ সালাম, জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, সেবাপ্রত্যাশী নাগরিক ও গণমাধ্যমকর্মীরা।অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দুর্নীতি শুধু উন্নয়নের অন্তরায় নয়, এটি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য একটি বড় হুমকি। দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ ন্যায্য সেবা থেকে বঞ্চিত হন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। তাই দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রশাসনের পাশাপাশি জনগণেরও সচেতন ও সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।গণশুনানিতে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোট ১১৮টি অভিযোগ জমা পড়ে। অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই শেষে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ না থাকায় ২২টি অভিযোগ বাতিল করা হয়। পরে অবশিষ্ট ৯৬টি অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানির শুরুতেই পাসপোর্ট অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ শুনানি করা হয়।গণশুনানিতে সেবাগ্রহীতা ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অনেক সমস্যার সমাধান দেন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। এতে উপস্থিত সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ও সন্তোষের অনুভূতি লক্ষ্য করা যায়।শুনানি শেষে দুর্নীতি দমন কমিশন ৯টি দপ্তরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অনুসন্ধান এবং একটি দপ্তরের বিরুদ্ধে গোপন গোয়েন্দা তদন্তের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো— গণপূর্ত বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কাস্টমস অ্যান্ড ভ্যাট, পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ রেলওয়ে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতাল ও সিভিল সার্জনের কার্যালয়। এছাড়া জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের বিরুদ্ধে গোপন গোয়েন্দা অনুসন্ধান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।বাকি অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও জেলা প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং বেশ কিছু সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান নিশ্চিত করা হয়। দুদকের কর্মকর্তারা জানান, অভিযোগগুলোর বিষয়ে পরবর্তীতেও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।গণশুনানিতে বক্তারা আরও বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হলে জনগণকে আরও সচেতন হতে হবে। জনসেবার প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে দুর্নীতি অনেকাংশে কমে আসবে। একই সঙ্গে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ও জনবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।দিনব্যাপী এ গণশুনানি সাধারণ মানুষের মাঝে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তাদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত আয়োজন করা হলে সরকারি সেবায় অনিয়ম ও দুর্নীতি কমবে এবং জনগণ দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবে।