সুমন আহমদ, বিশেষ প্রতিনিধি, (সুনামগঞ্জ) ||
ছাতকের সোনাই নদীতে ইজারাদার বিহীন রাতভর বালু লুটের মহোৎসব হুমকিতে জনপদ ও কোটি টাকার রাজস্ব! সুমন আহমদ, বিশেষ প্রতিনিধি, (সুনামগঞ্জ) সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ১নং ইসলামপুর ইউনিয়নের সোনাই নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান চললেও থামানো যাচ্ছে না বালু খেকোদের। দিনের বেলা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে নদী শান্ত থাকলেও, রাত নামলেই দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যায়। শুরু হয় বালু লুটের এক বিশাল মহোৎসব। একটি শক্তিশালী ও সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের এই আগ্রাসী কর্মকাণ্ডে একদিকে সরকার যেমন কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে তীব্র নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে শত শত ফসলি জমি, গ্রামীণ সড়ক ও স্থানীয় জনবসতি।স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে দু-একটি সরঞ্জাম জব্দ করা হলেও মূল হোতারা সব সময়ই রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি আবার আগের রূপ ধারণ করে। পুলিশ প্রশাসন সূত্রে থেকে জানা গেছে:- গত রোববার (১৭ মে) দুপুরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ছাতক নৌ পুলিশের একটি দল সোনাই নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে আচমকা অভিযান পরিচালনা করে। প্রায় কয়েক ঘণ্টাব্যাপী চলা এই অভিযানে বিকেল ৪টার দিকে অবৈধ বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত একটি শক্তিশালী ড্রেজার (লিস্টার) জব্দ করতে সক্ষম হয় পুলিশ।নৌ পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অবৈধ বালু খেকোদের রুখতে তাদের এই তৎপরতা নিয়মিত প্রক্রিয়ারই অংশ। তবে অভিযানের সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত শ্রমিক ও সিন্ডিকেটের সদস্যরা নৌকা নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করা সম্ভব হয়নি।দিনে নীরবতা, রাতে বালু লুটের মহোৎসব প্রশাসনের এমন ঝটিকা অভিযানকে স্থানীয় বাসিন্দারা সাধুবাদ জানালেও তাদের ক্ষোভ ও উদ্বেগের শেষ নেই। ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রশাসনের এই তৎপরতা কেবল দিনের বেলাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। বিকেল বা সন্ধ্যা পর্যন্ত নদী এলাকা শান্ত ও নীরব থাকলেও রাত ১০টার পর থেকেই পাল্টে যায় পুরো চিত্র। রাত ১০টা থেকে শুরু করে পরের দিন ফজর পর্যন্ত নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে শত শত বালুবাহী নৌকার আনাগোনা এবং ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার বিকট শব্দে স্থানীয়দের ঘুম হারাম হয়ে পড়েছে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসলামপুর ইউনিয়নের কয়েকজন বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দিনে পুলিশ আসে, ড্রেজার ধরে। কিন্তু পুলিশ চলে যাওয়ার পরেই রাত ১০টার পর থেকে শত শত ট্রলার আর নৌকা এসে নদী ছেয়ে ফেলে। ভোর পর্যন্ত চলে বালু কাটার উৎসব। আমরা সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো আমাদের ওপর হামলার হুমকি দেওয়া হয়।ভাঙন ঝুঁকিতে জনপদ, বিপন্ন ফসলি জমি দীর্ঘদিন ধরে সোনাই নদী থেকে যত্রতত্র, অপরিকল্পিত এবং অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকার পরিবেশ ও ভূগোল মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। প্রতিরাতে হাজার হাজার সেফটি বালু লুটের কারণে নদীর তলদেশ বিপজ্জনকভাবে গভীর হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বর্ষা মৌসুমের আগেই আশপাশের ফসলি জমি, গ্রামীণ কাঁচা-পাকা সড়ক এবং নদীর পাড়ে অবস্থিত বসতবাড়িগুলো ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের শত শত পরিবার, যারা যেকোনো মুহূর্তে তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। রয়্যালটির নামে প্রকাশ্য চাঁদাবাজি আঙুল ওবায়দুল্লাহ ও চান্দুর দিকেঅনুসন্ধানে ও স্থানীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এই অবৈধ বালু উত্তোলন ও পাচার প্রক্রিয়া সচল রাখতে নদীর বুকে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, নদী থেকে বালু লোড করে যাওয়ার সময় প্রতিটি বালুবাহী নৌকা থেকে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত নগদ চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।শুধু তাই নয়, সরকারি কোনো ইজারা বা বৈধ অনুমতি না থাকলেও রয়্যালটির নামে প্রতি ফুট বালুর বিপরীতে আরও ১৩ টাকা করে অবৈধভাবে পকেটে ভরছে এই চক্রটি। এই অবৈধ রয়্যালটি ও চাঁদা আদায়ের মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে ওবায়দুল্লাহ ও চান্দু নামের দুই ব্যক্তি সরাসরি জড়িত। তবে এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য তাদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কল রিসিভ করেননি। সোনাই নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে ছাতক নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোঃ আনোয়ার বলেন, সোনাই নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনায় ইতোমধ্যে দুটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। সর্বশেষ অভিযানেও আমরা একটি ড্রেজার জব্দ করেছি। আমাদের এই অভিযান কোনো সাময়িক বিষয় নয়, এটি অব্যাহত থাকবে। রাতের বেলা বালু উত্তোলনের বিষয়ে আমরা নজরদারি বাড়াচ্ছি এবং সুনির্দিষ্ট তথ্য ও জড়িতদের পরিচয় পাওয়া গেলেই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।অন্যদিকে, ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ মহি উদ্দীন বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন জানিয়ে বলেন,সোনাই নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। নদী ও পরিবেশ ধ্বংস করে কাউকে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করতে দেওয়া হবে না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনে নিয়মিত টহলের ব্যবস্থা করা হবে।এলাকাবাসী জানান:- দিনের নয়, চাই রাতের বিশেষ অভিযান এদিকে এলাকাবাসীর দাবি, বালু খেকোদের রুখতে হলে কেবল দিনের বেলার আনুষ্ঠানিক অভিযান যথেষ্ট নয়। অবিলম্বে রাতের আঁধারে চলা বালু লুট বন্ধে রাতের বিশেষ যৌথ অভিযান জোরদার করতে হবে। দেশের সম্পদ রক্ষা, ফসলি জমি বাঁচানো এবং চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের জরুরি ও স্থায়ী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ।