আসাদুজ্জামান, জেলা প্রতিনিধি, কুড়িগ্রাম ||
সুমি আক্তারের আকুতি: "আমগোর জীবন গেলে যাক, বাচ্চা দুইডারে বাচাইন"প্রতিনিধি, কুড়িগ্রাম: ১৬.০৬.২০২৬.খ্রি. কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে পুশইনের চেষ্টার শিকার ছয় ব্যক্তি তিন দিন ধরে আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। তাঁদের মধ্যে দুই শিশু ও একজন নারী রয়েছেন। খোলা আকাশের নিচে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটানো এসব মানুষের একজন সুমি আক্তার (২৫) আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘ভাই, আমগোর জীবন গেলে যাক, আমগোর বাচ্চা দুইডারে বাচাইন। এভাবে আর দুইডা দিন ফালায় রাখলে বাচ্চাগুলো মরে যাবে।মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে রৌমারী উপজেলার শৌলমারী ইউনিয়নের গয়টাপাড়া সীমান্তের আন্তর্জাতিক ১০৬০ নম্বর মেইন পিলারের ১ নম্বর সাব-পিলার এলাকার শূন্যরেখায় গিয়ে দেখা যায়, ছয়জন সেখানে অবস্থান করছেন। তাঁদের চারপাশে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া সামান্য খাবার ও পানি খেয়ে তাঁরা দিন কাটাচ্ছেন।সুমি আক্তার বলেন, ‘তিন দিন হইলো সীমান্তে বইসা আছি। কোনো দেশেই নিচ্ছে না। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ারও উপায় নাই। চারদিকে দুই দেশের বাহিনী ও মানুষ ঘিরে আছে। না খাইতে পেরে বুকের দুধ শুকায় গেছে। বাচ্চাডা ঠিকমতো দুধ পায় না।সেখানে দেখা যায়, সুমি আক্তারের বড় মেয়ে ফাতেমা খাতুন (৫) বাবার কোলে শুয়ে আছে। ছোট শিশু ফাহিমা খাতুন বারবার কান্না করছে। সুমি কখনো তার মুখে পানি দিচ্ছেন, কখনো বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। তবে অপুষ্টি ও খাদ্যসংকটের কারণে শিশুটিকে ঠিকমতো বুকের দুধ খাওয়াতে পারছেন না বলে জানান তিনি।পুশইনের শিকার ব্যক্তিরা হলেন ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া এলাকার কংশেরকুল গ্রামের বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন (৩৫), তাঁর স্ত্রী সুমি আক্তার (২৫), তাঁদের দুই সন্তান ফাতেমা ও ফাহিমা, একই গ্রামের সজীব মিয়া (২৬) ও হিমেল মিয়া।বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে দালালের মাধ্যমে কাজের আশায় ভারতে গেছিলাম। লোভে পড়ে ভারত গেছিলাম। পরে সেদেশে আটক হই। রোববার ভোরে কাঁটাতার পার করে দিছে। তিন দিন ধইরা নো ম্যান্স ল্যান্ডে বসে আছি। আমরা বাংলাদেশি।’স্থানীয় সূত্র ও বিজিবি জানায়, রোববার ভোরে ভারতের ঝালুরচর বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা এক নারী, তিন পুরুষ ও দুই শিশুসহ ছয়জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের বাধা এবং বিজিবির সতর্ক অবস্থানের কারণে তাঁরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেননি। এরপর থেকেই তাঁরা আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন।ঘটনার পর রোববার দুপুরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে জরুরি পতাকা বৈঠক করে। তবে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত কোনো সমাধান হয়নি। ফলে নারী ও শিশুসহ ছয়জন মানবেতর অবস্থায় খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন।সজীব মিয়ার এলাকার গ্রাম পুলিশ সদস্য মোশারফ হোসেন বলেন, টেলিভিশন ও পত্রিকায় সংবাদ দেখে তাঁরা আটক ব্যক্তিদের শনাক্ত করেছেন। তাঁরা কিছুদিন আগে কাজের সন্ধানে ভারতে গিয়েছিলেন। বিষয়টি জানিয়ে বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে তিন দিন পার হলেও তাঁদের ফেরানোর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।গয়টাপাড়া বিজিবি ক্যাম্পের সুবেদার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পুশইনের বিষয়টি নিয়ে পতাকা বৈঠক হয়েছে। আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছি, যথাযথ রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। বর্তমানে তাঁরা নো ম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থান করছেন।’