সুমন আহমদ, দোয়ারাবাজার, (সুনামগঞ্জ) ||
ছাতকে সোনাই নদীতে ড্রেজার সিন্ডিকেটের তাণ্ডব তীব্র নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারানোর আশঙ্কায় এলাকাবাসী, নীরব ভূমিকার অভিযোগে ক্ষোভসুমন আহমদ, দোয়ারাবাজার, (সুনামগঞ্জ) সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী সোনাই নদীতে টানা ও বেপরোয়াভাবে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন। প্রভাবশালী চক্রের এই অপকর্মের কারণে পরিবেশের ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে চরম উদ্বেগ ও চরম ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।এলাকাবাসীর অভিযোগ, একশ্রেণির অসাধু ও প্রভাবশালী বালুখেকো চক্র দিনের আলো আড়াল হতেই নদীতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। গভীর রাতে শক্তিশালী ড্রেজার মেশিন বসিয়ে নদীর তলদেশ থেকে অবাধে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ড্রেজারে বালু তোলার বিকট শব্দে রাতে নদীপাড়ের মানুষের ঘুম হারাম হয়ে পড়ে। এভাবে নিয়মবহির্ভূত ও অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর প্রাকৃতিক গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে এবং নদীর দুই পাশের তীরজুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র ধস।নদীভাঙনের সরাসরি শিকার হচ্ছেন নদীসংলগ্ন গ্রামগুলোর শত শত সাধারণ মানুষ। শত শত একর কৃষিজমি, বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও যাতায়াতের সড়ক এখন ভাঙনের মুখে পড়ে বিলীন হওয়ার হুমকিতে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয়দের দাবি, এভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে খুব শীঘ্রই তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে নিঃস্ব হয়ে পথে বসতে হবে। এছাড়া সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সিন্ডিকেটটি আঙুল ফুলে কলাগাছ হলেও পরিবেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে, তা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়।স্থানীয় বাসিন্দারা আক্ষেপ করে জানান, দীর্ঘদিন ধরে নদীর একাধিক পয়েন্টে প্রকাশ্যে ও গোপনে বালু তোলা হলেও তা বন্ধে প্রশাসনিক কোনো স্থায়ী বা কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। প্রশাসনের এই ধরনের শিথিল নজরদারির সুযোগ নিয়েই অবৈধ চক্রটি দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী বাসিন্দা অভিযোগ করেন, রাতে যখন নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন শুরু হয়, তখন তৎক্ষণাৎ নৌ পুলিশ ফাঁড়িতে কল দেওয়া হলেও অধিকাংশ সময় পুলিশ থেকে দ্রুত কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। কখনো কখনো ফোন রিসিভই করা হয় না। পুলিশের এই ধরনের ঢিলেঢালা ও অনীহামূলক আচরণের কারণেই বালুদস্যুরা কোনো ভয়ডর না পেয়ে নির্বিঘ্নে তাদের অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে।অভিযোগের সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে ছাতক নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (আইসি) কর্মকর্তা মোঃ আনোয়ার হোসেনের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।পরবর্তীতে সরাসরি নৌ পুলিশের কেন্দ্রীয় হেল্পলাইনে যোগাযোগ করা হলে দায়িত্বরত প্রতিনিধি জানান, আমরা ছাতক নৌ পুলিশ ফাঁড়িতে বিষয়টি সম্পর্কে জানাতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। হয়তো তারা বিশেষ কোনো ডিউটি বা অন্য কোনো ঝামেলার মধ্যে থাকার কারণে কলটি রিসিভ করতে পারেননি।এদিকে নদী রক্ষার বিষয়টি নিয়ে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখা অর্থাৎ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল আশ্বাস দিয়ে বলেন, সোনাই নদীর এই অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়টি আমাদের পূর্ণ নজরে রয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে সব ধরনের অবৈধ বালু উত্তোলন কঠোরভাবে বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে এবং অচিরেই যারা এর পেছনে জড়িত রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।অন্যদিকে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মহিউদ্দিন, জানান, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। আমরা ইতোমধ্যে নদীটিতে একাধিকবার ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করেছি। তবে কেবল প্রশাসনিক অভিযানই যথেষ্ট নয়, এটি চিরতরে বন্ধ করতে প্রশাসনের তদারকির পাশাপাশি স্থানীয় জনসাধারণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ও সচেতন পদক্ষেপও অত্যন্ত জরুরি।