মো: ইলিয়াছ মিয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ||
বিশ্বমানের বিদ্যাপীঠ গড়ার প্রত্যয়ে চবি সিনেটের ৩৬তম বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিতচট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ড. এ.আর. মল্লিক ভবনের উপাচার্য দপ্তর সভাকক্ষে আজ শনিবার বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের ৩৬তম বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান সভায় সভাপতিত্ব করেন। প্রাণবন্ত এই সভায় ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ৫০৩ কোটি ৪৭ লক্ষ ৩৭ হাজার টাকার মূল বাজেট এবং ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের জন্য ৪৮৯ কোটি ৯৯ লক্ষ ৭৯ হাজার টাকার সংশোধিত বাজেট অনুমোদিত হয়। বাজেট উপস্থাপন করেন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার জনাব মোঃ হাছান মিয়া।জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন, পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ থেকে পাঠ এবং প্রয়াত বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের স্মরণে শোকপ্রস্তাব পেশের মাধ্যমে সভার কাজ শুরু হয়। সভাপতির বক্তব্যের পূর্বে ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর গণআন্দোলন এবং ২০২৪-এর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সকল শহীদদের স্মরণে ১ মিনিট নীরবতা পালন, দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান তাঁর বক্তব্যে ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২৪-এর জুলাই বিপ্লবে আত্মাহুতি দেওয়া শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ ওয়াসিম আকরাম এবং চবি পরিবারের শহীদ হৃদয় চন্দ্র তরুয়া ও শহীদ ফরহাদ হোসেনসহ সকল শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানান। তিনি মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া এবং চবি প্রতিষ্ঠাতাদের অবদান স্মরণ করেন। একই সাথে দায়িত্ব অর্পণের জন্য বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।উপাচার্য জানান," চবি শিক্ষা ও গবেষণাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ"উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন ১/ ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে 'Outcome-Based Education' (OBE) ও অভিন্ন সেমিস্টার পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।২/ ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে শিক্ষক ও গবেষকদের জন্য গবেষণা সেলের অধীনে ১০ কোটি টাকা অনুদানসহ অন্যান্য খাতে বরাদ্দ চালু রাখা হয়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্য ইউজিসির কাছে ২৯ কোটি টাকা অনুদানের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।৩/ প্রাতিষ্ঠানিক মান নিশ্চিতকরণে গত এক বছরে ৩০টির বেশি প্রশিক্ষণ ও সেমিনার আয়োজন করা হয়েছে।৪/ বিশ্বব্যাংক ও সরকারের অর্থায়নে ২৯.৭৪ কোটি টাকার ৮টি সাব-প্রজেক্ট চলমান এবং ২য় রাউন্ডে আরও ৫২টি প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে।পরবর্তীতে উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়কে আধুনিকায়ন ও শিক্ষার্থীবান্ধব করতে বড় ধরনের অবকাঠামোগত পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। ১) টিএসসি (TSC) প্রতিষ্ঠার জন্য ৪৯.৩৩ কোটি টাকা এবং একাডেমিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ৬৭৮.১৪ কোটি টাকার দুটি উন্নয়ন প্রকল্প (DPP) অনুমোদন প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এর মাধ্যমে ১০ তলা ছাত্রী হল, একাডেমিক ভবন, সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টসহ নানা সুবিধা যুক্ত হবে। ২) ছাত্রদের ৫টি ও ছাত্রীদের ৫টি (প্রতিটি ১০ তলা) আবাসিক হল, ৫০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল, ব্লু-ইকোনমি রিসার্চ সেন্টার, সুইমিং পুল, এডভান্সড রিসার্চ ল্যাব ও ডরমেটরি নির্মাণের জন্য বিশাল পরিকল্পনা জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্তির অপেক্ষায় আছে। ৩) পুরো ক্যাম্পাসে হাই-পাওয়ার্ড ওয়াই-ফাই, IoT নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ অটোমেশন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।সিনেট সভায় শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন চবি মাননীয় উপ-উপাচার্য (শিক্ষা ) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল-আমীন ও মাননীয় উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. সফিকুল ইসলাম।শুভেচ্ছা বক্তব্যে চবি মাননীয় উপ-উপাচার্য ( শিক্ষা ) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল-আমীন সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে এবং শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে বলেন, "চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দেশের শিক্ষা-ব্যবস্থা আধুনিকায়নে নেতৃত্বদানকারী অন্যতম প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। গবেষণার পাশাপশি কারিকুলামে বৈচিত্র্য আনয়ন, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থার সাথে শিক্ষার্থীদের সরাসরি সংযোগ ঘটানোর মাধ্যমে তাদেরকে কর্মক্ষেত্রের উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ভবিষ্যৎ চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবেলায় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে ইনোভেশন হাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিষ্ঠাচার, নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলাবোধ, লিডারশীপ, সৃজনশীলতা প্রভৃতি বৃদ্ধির জন্য এক্সট্রা-কারিকুলাম এক্টিভিটিজের যেনো বিকল্প নেই। এর লক্ষ্যে খেলাধুলা, ক্রীড়া-প্রতিযোগিতা, সংস্কৃতিচর্চা, চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা, রচনা প্রতিযোগিতা, বিভাগীয় টুর্নামেন্ট, আন্তঃবিভাগীয় টুর্নামেন্ট, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, চিত্রকলা প্রদর্শনী, অ্যালামনাইদের পুনর্মিলনী প্রভৃতি এক্সট্রা-কারিকুলাম এক্টিভিটিজের আয়োজন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যায়ে বছরব্যাপী চলমান।"শুভেচ্ছা বক্তব্যে মাননীয় উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. সফিকুল ইসলাম সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, "সৎ ও দক্ষ মানবসম্পদ সুশাসনের অন্যতম উপাদান। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সৎ ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও বাজেট প্রস্তাব করেছে এবং এই লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল রিসার্চ সেন্টার এবং IQAC চাহিদানুসারে প্রশিক্ষণ প্রদান করে সৎ ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরী করবে।"চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট-এর ৩৬তম বার্ষিক সভায় আমন্ত্রিত সংসদ সদস্যবৃন্দের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ও উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সাংসদ সরওয়ার জামাল নিজাম, চট্টগ্রাম-৮ আসনের এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম-৬ আসনের গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১০ আসনের সাঈদ আল নোমান এবং চট্টগ্রাম-৯ আসনের মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান।এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, ঢাবি, শাবিপ্রবি, জাবি-র শিক্ষকবৃন্দ, ব্রি-র মহাপরিচালক এবং রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটসহ বিশিষ্ট সিনেটরবৃন্দ আলোচনায় সক্রিয় অংশ নেন। পরিশেষে উপাচার্য উপস্থিত সকল অতিথি, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।