ইমরান হোসেন, যশোর জেলা প্রতিনিধি ||
যশোরের কেশবপুরে সরকারি বাওড় দখল ও মাছ লুটের অভিযোগ: আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে মৎস্যজীবীদের সংবাদ সম্মেলনইমরান হোসেন, যশোর জেলা প্রতিনিধি:- যশোরের কেশবপুরে সরকারের কাছ থেকে নিয়ম মেনে ইজারা নেওয়া বাওড় থেকে প্রকাশ্যে মাছ লুটের অভিযোগ উঠেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতা ও একাধিক হত্যা মামলার আসামি মুজিবার রহমান মুজের বিরুদ্ধে। চরম উদ্বেগের বিষয় হলো—ভুক্তভোগী মৎস্যজীবীরা যখন বাওড়ের পাড়ে উপস্থিত হয়ে নিজেদের আকুতি তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন করছিলেন, ঠিক সেই সময়েও অভিযুক্ত ও তার সহযোগীদের বাওড় থেকে জোরপূর্বক মাছ আহরণ করতে দেখা যায়।রোববার (৯ আগস্ট) সকাল ১০টায় কেশবপুর উপজেলার মির্জানগর বাওড় প্রাঙ্গণে বেগমপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড ও স্থানীয় গ্রামবাসী যৌথভাবে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সংবাদ সম্মেলনে সর্বসাধারণের পক্ষে লিখিত বিবরণ পাঠ করেন ১ নম্বর ত্রিমোহিনী ইউনিয়ন পরিষদের তিনবারের নির্বাচিত সাবেক সদস্য শেখ আব্দুস সাত্তার।ইজারা ও বর্তমান সংকটের চিত্র: সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, মির্জানগর ১১ নম্বর মৌজায় অবস্থিত ১৭ একর ৫২ শতক আয়তনের সরকারি বাওড়টি প্রতি বছর ২ লাখ টাকা রাজস্ব নির্ধারণ করে সরকারের কাছ থেকে ইজারা নেয় 'বেগমপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিঃ'। সমিতির সভাপতি আব্দুল আজিজ জানান, চলতি ২০২৬ সাল থেকে ২০২৮ সাল (বাংলা ১৪৩৫) পর্যন্ত তিন বছর মেয়াদে তারা নিয়মমাফিক এটি ইজারা পান। সমিতির ১০১ জন সদস্যের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র সম্বল এই বাওড়ে চলতি বছরে প্রায় ২০ লাখ টাকার পোনা মাছ ছাড়া হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা মুজে ও তার সশস্ত্র বাহিনীর ক্রমাগত মাছ লুটের ফলে কোটি টাকার ক্ষতি মুখে পড়ে সমিতিটির ১০১টি পরিবার আজ পুরোপুরি নিঃস্ব হতে বসেছে।জমির তফসিল ও আইনি লড়াইয়ের দলিল: সংবাদ সম্মেলনে বাওড়টির মালিকানার আইনি ও ঐতিহাসিক পটভূমি বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। এতে জানানো হয়: জমির বিবরণ: বাওড়টি কেশবপুরের মির্জানগর ১১ নম্বর মৌজায় অবস্থিত (সিএস খতিয়ান নং- ১৯, ২০ ও ২১; দাগ নং- ৬৪১, ১১৭৩ ও ৮৩০)। তৎকালীন ভারত সম্রাটের অধীনস্ত জমিদার তারেকেশ্বর পাল চৌধুরীর দখলে থাকা এই জমি ১৯৫০ সালের জমিদারি উচ্ছেদ ও প্রজাসত্ব আইনের ২০ ধারা অনুযায়ী সরকারি সম্পত্তিতে পরিণত হয়। সরকারের চূড়ান্ত অধিগ্রহণ: ১৯৫৪ সালে নড়াইল থানার আশুতোষ রায়কে তৎকালীন ৬২০ টাকা ৯৯ পয়সা ক্ষতিপূরণ প্রদানের মাধ্যমে সরকার বাওড়টির ১৬ আনা চূড়ান্ত মালিকানা অর্জন করে (তৌজি নং- ৫৭৫৪, খাজনা প্রাপ্তির খতিয়ান নং- ১৯, সিএরোল নং- ২৭৯)। বাওড়টির সামিল ও জমার কারণে এটি অত্র এলাকার ১৭ নং গোপসেনা মৌজার ৩ নম্বর সিএরোল ভুক্ত হয়। ভুল রেকর্ড সংশোধন: মনিরামপুর উপজেলার লক্ষিকান্তপুর গ্রামের ইসমাইল গাজীর নামে ভুলবশত বাওড়টি এসএ রেকর্ড হলে, পরবর্তীতে সেটেলমেন্ট ম্যানুয়ালের ৫৩৩ ধারার বিধানে (কেস নং- ১০৬/৩৮, ১৯৬৪) তা বাতিল করে সরকারের নামে নথিবদ্ধ করা হয়। মামলা ও চক্রান্ত প্রতিরোধ: পরবর্তীতে সাহিদা খাতুন ও আব্দুর রশিদ গং বাওড়টি দখলের উদ্দেশ্যে যশোর সাবজজ আদালতে একতরফা দেওয়ানী মামলা (নং- ৬৫/৬৮) দায়ের করেন। যদিও ১ম বিবাদী ইসমাইল গাজী ২৪/১০/১৯৬৮ তারিখে আদালতে লিখিত বক্তব্য দিয়ে বাওড়টি সরকারের বলে স্বীকার করেন, তবুও পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে অর্থের বিনিময়ে সাহিদা খাতুন গংদের সাথে সোলে করে একতরফা ডিগ্রি হাসিল করেন। সরকারি সম্পত্তি রক্ষা ও ডিসির তদন্ত: জালিয়াতির খবর পেয়ে ইউপি সদস্য শেখ আব্দুস সাত্তার তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন জানান (স্মারক নং- ৩২০১/এসএ, তারিখ: ১১/১২/১৯৯৩)। এর প্রেক্ষিতে যশোর জেলা প্রশাসক তদন্ত শেষে ১৯/০৯/১৯৯৪ তারিখে জলমহালটি সরকারের অনুকূলে নেওয়ার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন, যার ভিত্তিতে বাওড়টি এসএ ও আরএস রেকর্ডে সরকারি ১ নম্বর খতিয়ানেই বহাল থাকে।সহিংসতা, হত্যা ও গৃহহীন হওয়ার ট্র্যাজেডি: সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় মুখ্য ভূমিকা পালন করায় মুজে বাহিনীর চরম অক্রোশের শিকার হতে হয় আব্দুস সাত্তারকে। সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করে বলেন, সরকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় মুজে গং তার বিরুদ্ধে একাধিক মিথ্যা মামলা করে ব্যর্থ হয়। এরপর ক্ষিপ্ত হয়ে ২০১২ সালে তারা সাত্তারের ছোট ভাই শেখ আব্দুল্যা বাবুকে নির্মমভাবে হত্যা করে (মামলা নং- ১২, তারিখ: ১৭/০১/২০১২, যা বর্তমানে বিচারাধীন)। কেবল হত্যাই নয়, মুজে বাহিনীর ক্রমাগত অত্যাচার ও ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের শিকার হয়ে সাবেক এই ইউপি সদস্য বর্তমানে পরিবার নিয়ে বেনাপোলে শরণার্থী জীবনযাপন করছেন।প্রশাসনের কাছে আকুল আবেদন: সংবাদ সম্মেলন চলাকালেও প্রকাশ্য মাছ লুটের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ভুক্তভোগীরা জানান, আইনি লড়াই চালাতে গিয়ে তারা জমিজমা হারিয়েছেন, আর এখন বাওড়ের মাছ হারিয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ ঘটনায় দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে সন্ত্রাসী মুজে বাহিনীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে তারা যশোর জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।সংবাদ সম্মেলনে মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুল আজিজসহ স্থানীয় বিপুলসংখ্যক গ্রামবাসী উপস্থিত ছিলেন।এদিকে, বাওড় থেকে জোরপূর্বক মাছ মারার অভিযোগের বিষয়ে জানতে মুজিবার রহমান মুজের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন ও চটে যান।