আবুজর গিফারী, পাবনা প্রতিনিধি ||
পাবনার ভাঁড়ারায় চায়না কাটার দিয়ে অবাধে বালু উত্তোলন: ভাঙনে বিলীন ফসলি জমি, নেপথ্যে শক্তিশালী সিন্ডিকেটআবুজর গিফারী, পাবনা প্রতিনিধি:- পাবনা সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ইউনিয়নের জোত কাকুরিয়া কলাবাগান এলাকায় পদ্মা নদী থেকে চায়না কাটার দিয়ে অবাধে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। নদীর তীর ঘেঁষে আশঙ্কাজনকভাবে বালু তোলার কারণে ইতোমধ্যে এলাকায় তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। ফলে স্থানীয় কৃষকদের শত শত বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আর এ কাজের প্রতিবাদ বা বাধা দিলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী কৃষকেরা।স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করে প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এ অপকর্ম চালিয়ে আসছে। প্রতিদিন ভোররাত ৩টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে তাদের বালু তোলার কারবার। আরও মারাত্মক অভিযোগ হলো, স্পিডবোটে নৌ পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল চলাকালেই চোখের সামনে অস্ত্রসহ পাহারা দিয়ে এভাবে প্রকাশ্যে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, জোত কাকুরিয়া কলাবাগান এলাকায় পদ্মা নদীতে প্রকাশ্যে ছয়টি শক্তিশালী ‘চায়নিজ কাটার মেশিন’ বসিয়ে নদীগর্ভ থেকে বালু তোলা হচ্ছে। সেই উত্তোলিত বালু শতাধিক ট্রলারে লোড করে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে পাবনার ভাঁড়ারা, দোগাছী, চরতারাপুর, পাকশী, সুজানগর ছাড়াও পার্শ্ববর্তী কুষ্টিয়ার পাংশা, কুমারখালী ও রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে। স্থানীয়দের হিসাব অনুযায়ী, এই ঘাট থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার অবৈধ বালু বাণিজ্য হচ্ছে, যার একটা বড় অংশ বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলে ভাগবাটোয়ারা হয়ে যাচ্ছে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কৃষক ক্ষোভ ও আতঙ্ক প্রকাশ করে বলেন, "নৌ পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতেই সশস্ত্র পাহারায় বালু কাটা হচ্ছে। কেউ একটু প্রতিবাদ করলেই অস্ত্র উঁচিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। স্থানীয় প্রশাসনের কাছে একাধিকবার লিখিত ও মৌখিকভাবে অভিযোগ জানিয়েও কোনো প্রতিকার মিলছে না।"অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সেলিম আলতাফ জর্জের ঘনিষ্ঠ সহযোগী আব্দুল আলিম এবং পাবনার দোগাছী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান হযরত আলীসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির একটি সিন্ডিকেট এই অবৈধ বালু মহাল নিয়ন্ত্রণ করছে। এছাড়া চর বলরামপুর এলাকার খোকন নামের এক ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে মাঠে থেকে পুরো বালু উত্তোলনের কাজ পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, গত এক সপ্তাহ আগে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে অভিযুক্ত আব্দুল আলিমকে দেখা যায় এবং তিনি পরিচিতদের কাছে ঘাটটি সচল করার জন্য 'সব জায়গা ম্যানেজ হয়ে গেছে' বলেও দাবি করেন।এদিকে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম সহিংসতা ও আতঙ্কের আবহ বিরাজ করছে। প্রায় এক থেকে দেড় মাস আগে এই এলাকাতেই অবৈধ বালু উত্তোলনে বাধা দিতে গিয়ে মঞ্জু শেখ নামের স্থানীয় এক বিএনপি নেতা গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। ওই হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও একইভাবে বালু উত্তোলন শুরু হওয়ায় চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ। যে কোনো মুহূর্তে আবারও বড় ধরনের সশস্ত্র সংঘর্ষ ও রক্তপাতের আশঙ্কা করছেন তারা।অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত আব্দুল আলিমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।তবে এ বিষয়ে পাবনার পুলিশ সুপার (এসপি) আশ্রাফ আলী জানান, “টেলিফোনে বিষয়টি অনেকেই আমাদের জানিয়েছেন। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খোঁজখবর নিচ্ছি এবং দ্রুতই প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”পাবনা জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে কেবল জানলাম। দ্রুত বিষয়টি তদন্ত করে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”