অপূর্ব সরকার, পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধি ||
চরকারফারমার শিশুদের আকুতি: 'আমরা সাঁতরে নয়, হেঁটে স্কুলে যেতে চাই'অপূর্ব সরকার, পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধি:- সকালের আলো ফুটতেই বই-খাতা নিয়ে ঘর থেকে বের হয় শিশুরা। গন্তব্য স্কুল—কিন্তু অন্য দশটি শিশুর মতো তাদের এই যাত্রা সুগম কিংবা কোনো সড়ক ধরে নয়। প্রথমে খেয়ায় চড়ে উত্তাল নদী পার হওয়া, তারপর কিছুটা পথ হাঁটা, আর সবশেষে একে একে সাঁতরে পার হতে হয় পাঁচটি খাল। পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার সদর ইউনিয়নের আগুনমুখা মোহনাঘেরা দুর্গম চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের এভাবেই প্রতিদিন সংগ্রাম করে স্কুলে যেতে হয়।ঋতু বদলালেও এই শিশুদের স্কুলে যাওয়ার পথ বদলায় না। শীত, বর্ষা কিংবা বসন্ত—বছরের প্রায় সব সময়ই খাল সাঁতরে বিদ্যালয়ে যেতে হয় তাদের। বৃষ্টির দিনে দুর্ভোগ পৌঁছায় চরমে; শরীরের সঙ্গে সঙ্গে ভিজে একাকার হয়ে যায় বই-খাতা। স্কুলে পৌঁছানোর পরও ভেজা পোশাকেই কাট কাটাতে হয় দিনের একটা বড় সময়, যা থেকে শিশুরা প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ে। কোনো নিরাপদ নৌযান, রাস্তা বা সেতুর ব্যবস্থা না থাকায় দিন দিন শিক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়ছে দ্বীপটির কোমলমতি শিশুরা।চরকারফারমা দ্বীপটি বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি আগুনমুখা, রাবনাবাদ ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় অবস্থিত। চরে কোনো বেড়িবাঁধ না থাকায় জোয়ারের পানিতে নিয়মিত তলিয়ে যায় চলাচলের পথ ও স্কুলের মাঠ। চরের প্রায় ৮০টি জেলে ও কৃষক পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ দিতে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এই স্কুলটি। বর্তমানে ৫১ জন শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছেন তিনজন শিক্ষক। কিন্তু পাঠশালা আর শিক্ষক থাকলেও নেই শুধু নিরাপদে যাতায়াতের ব্যবস্থা।দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. জহিরুল ইসলাম জানায়, "আমাগো বাড়ি দিয়া স্কুলে আইতে পাঁচটা খাল সাঁতরাইয়া আসতে হয়। প্রতিদিন ৭-৮ জন মিলে সাঁতরে স্কুলে আসি, বৃষ্টি হইলে বই-খাতা ভিইজ্জা যায়।" প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইয়াসিন বলে, "শরীর সারাদিন ভিইজ্যা থাইকা খারাপ করে, তখন কয়েকদিন স্কুলেই যাইতে পারি না।"স্থানীয় বাসিন্দা ও স্কুলের সাবেক সভাপতি শাহিদা বেগম জানান, তিনি জায়গা দিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেও রাস্তা করার সামর্থ্য তাঁর নেই। এদিকে সদর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর হোসেন টুটু জানান, আপাতত বরাদ্দ না থাকলেও ভবিষ্যতে বরাদ্দ পেলে রাস্তার কাজ করা হবে।বিষয়টিকে অত্যন্ত দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. গোলাম সগীর এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মো. ইজাজুল হক জানান, বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। দ্রুত স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে শিশুদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।