অবৈধভাবে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের দায়ে একেএইচ লজিস্টিকসকে জরিমানা
স ম জিয়াউর রহমান, চট্টগ্রাম থেকে : সরকারের আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করেই চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পাহাড় কাটা ও ৫ হাজারেরও বেশি গাছ নিধন করে অবৈধভাবে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের দায়ে একেএইচ লজিস্টিকস নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে বড় ধরনের দণ্ডের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে প্রতিষ্ঠানটিকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করার পাশাপাশি এক কর্মকর্তাকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে।
১৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের বাড়বকুণ্ড বাজারের পূর্ব পাশে মকবুলার রহমান জুট মিল এলাকায় এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন সীতাকুণ্ড উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মামুন।
অভিযান সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বাড়বকুণ্ড এলাকায় একেএইচ লজিস্টিকস অবৈধভাবে একটি বিশাল পাহাড় কেটে সমতল করছিল। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের সরাসরি মদদে পাহাড় কাটার পাশাপাশি একটি বড় পুকুরও ভরাট করে আসছিল তারা। টার্মিনাল নির্মাণের নামে তারা এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্যকে মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
তাছাড়া এই কনটেইনার টার্মিনাল করার জন্য ওই এলাকায় থাকা আম, জাম, কাঁঠাল ও জামরুলসহ প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি ফলদ ও বনজ গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। সবুজে ঘেরা পাহাড়কে মরুভূমিতে রূপান্তর করে বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিলের এই চিত্র দেখে খোদ অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তারাও হতভম্ব হয়ে যান। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চালানো এই অভিযানে অপরাধের সত্যতা পাওয়ার পর পাহাড় কাটা ও পরিবেশ ধ্বংসের বিষয়টি হাতেনাতে প্রমাণিত হয়।
অভিযানে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে দোষী সাব্যস্ত করে একেএইচ লজিস্টিকসের কর্মকর্তা ফরিদ আহমেদকে (৫০) ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। সাজাপ্রাপ্ত ফরিদ আহমেদ ঢাকা জেলার আশুলিয়া থানার সাভার নবীনগর এলাকার মৃত ফজলুল হকের ছেলে। একই সাথে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতির জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
অভিযান শেষে ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, একেএইচ লজিস্টিকস লিমিটেড প্রকল্পের অনুকূলে কোনো ধরনের বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। তারা পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা জেলা প্রশাসন—কারো কাছ থেকেই কোনো অনুমোদন নেয়নি। পাহাড় কাটা, পুকুর ভরাট এবং নির্বিচারে গাছপালা কাটা পরিবেশের ওপর এক ধরণের অপরাধ। আমরা এই প্রকল্পের যাবতীয় কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ফখরুল ইসলাম জানান, পরিবেশ রক্ষায় সীতাকুণ্ডে এই ধরনের অভিযান নিয়মিত পরিচালনা করা হবে। পাহাড় কাটা ও জলাশয় ভরাটের মতো পরিবেশবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অবস্থান হবে ‘জিরো টলারেন্স’।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেকদিন ধরে আড়ালে পাহাড় কাটা চললেও ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়নি। প্রশাসনের এই কঠোর পদক্ষেপে এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে। তবে পরিবেশবাদীদের দাবি, যে পরিমাণ গাছ কাটা হয়েছে এবং পাহাড়ের যে ক্ষতি হয়েছে, তার তুলনায় ২ লাখ টাকা জরিমানা খুবই সামান্য। তারা এই ধ্বংসযজ্ঞের সাথে জড়িত স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রকেও আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
অভিযান চলাকালে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক চন্দন বিশ্বাস এবং সীতাকুণ্ড মডেল থানার পুলিশের একটি চৌকস দল সার্বিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতা প্রদান করেন।
এদিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড অবৈধভাবে গড়ে ওঠা একেএইচ লজিস্টিকসকে ২ লক্ষ টাকা জরিমানা করায় অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে চট্টগ্রামের পরিবেশ, জলবায়ু, কৃষি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গ্রীন চট্টগ্রাম এ্যালায়েন্স। তারা বিবৃতিতে বলেন, একেএইচ লজিস্টিকস পরিবেশ, কৃষি ও জলবায়ুর যে পরিমাণ ক্ষতি করেছে তা ১০০ কোটি টাকারও বেশি। এখানে জরিমানা কম হওয়ায় অপরাধী অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে অনুৎসাহী হবে। জরিমানার পরিমাণ ও জেল বেশি হলে অপরাধ কমবে বলে দাবি করেন তারা। বিবৃতিতে তারা আরও বলেন, এ একেএইচ লজিস্টিকসকে স্হায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে এবং মালিককে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দ্রুত এ বিষয় নিয়ে প্রশাসন কঠোর না হলে গ্রীন চট্টগ্রাম এ্যালায়েন্স বিভিন্ন কর্মসূচী ঘোষণা করতে বাধ্য হবে।

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬
অবৈধভাবে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের দায়ে একেএইচ লজিস্টিকসকে জরিমানা
স ম জিয়াউর রহমান, চট্টগ্রাম থেকে : সরকারের আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করেই চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পাহাড় কাটা ও ৫ হাজারেরও বেশি গাছ নিধন করে অবৈধভাবে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের দায়ে একেএইচ লজিস্টিকস নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে বড় ধরনের দণ্ডের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে প্রতিষ্ঠানটিকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করার পাশাপাশি এক কর্মকর্তাকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে।
১৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের বাড়বকুণ্ড বাজারের পূর্ব পাশে মকবুলার রহমান জুট মিল এলাকায় এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন সীতাকুণ্ড উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মামুন।
অভিযান সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বাড়বকুণ্ড এলাকায় একেএইচ লজিস্টিকস অবৈধভাবে একটি বিশাল পাহাড় কেটে সমতল করছিল। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের সরাসরি মদদে পাহাড় কাটার পাশাপাশি একটি বড় পুকুরও ভরাট করে আসছিল তারা। টার্মিনাল নির্মাণের নামে তারা এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্যকে মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
তাছাড়া এই কনটেইনার টার্মিনাল করার জন্য ওই এলাকায় থাকা আম, জাম, কাঁঠাল ও জামরুলসহ প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি ফলদ ও বনজ গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। সবুজে ঘেরা পাহাড়কে মরুভূমিতে রূপান্তর করে বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিলের এই চিত্র দেখে খোদ অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তারাও হতভম্ব হয়ে যান। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চালানো এই অভিযানে অপরাধের সত্যতা পাওয়ার পর পাহাড় কাটা ও পরিবেশ ধ্বংসের বিষয়টি হাতেনাতে প্রমাণিত হয়।
অভিযানে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে দোষী সাব্যস্ত করে একেএইচ লজিস্টিকসের কর্মকর্তা ফরিদ আহমেদকে (৫০) ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। সাজাপ্রাপ্ত ফরিদ আহমেদ ঢাকা জেলার আশুলিয়া থানার সাভার নবীনগর এলাকার মৃত ফজলুল হকের ছেলে। একই সাথে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতির জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
অভিযান শেষে ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, একেএইচ লজিস্টিকস লিমিটেড প্রকল্পের অনুকূলে কোনো ধরনের বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। তারা পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা জেলা প্রশাসন—কারো কাছ থেকেই কোনো অনুমোদন নেয়নি। পাহাড় কাটা, পুকুর ভরাট এবং নির্বিচারে গাছপালা কাটা পরিবেশের ওপর এক ধরণের অপরাধ। আমরা এই প্রকল্পের যাবতীয় কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ফখরুল ইসলাম জানান, পরিবেশ রক্ষায় সীতাকুণ্ডে এই ধরনের অভিযান নিয়মিত পরিচালনা করা হবে। পাহাড় কাটা ও জলাশয় ভরাটের মতো পরিবেশবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অবস্থান হবে ‘জিরো টলারেন্স’।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেকদিন ধরে আড়ালে পাহাড় কাটা চললেও ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়নি। প্রশাসনের এই কঠোর পদক্ষেপে এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে। তবে পরিবেশবাদীদের দাবি, যে পরিমাণ গাছ কাটা হয়েছে এবং পাহাড়ের যে ক্ষতি হয়েছে, তার তুলনায় ২ লাখ টাকা জরিমানা খুবই সামান্য। তারা এই ধ্বংসযজ্ঞের সাথে জড়িত স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রকেও আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
অভিযান চলাকালে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক চন্দন বিশ্বাস এবং সীতাকুণ্ড মডেল থানার পুলিশের একটি চৌকস দল সার্বিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতা প্রদান করেন।
এদিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড অবৈধভাবে গড়ে ওঠা একেএইচ লজিস্টিকসকে ২ লক্ষ টাকা জরিমানা করায় অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে চট্টগ্রামের পরিবেশ, জলবায়ু, কৃষি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গ্রীন চট্টগ্রাম এ্যালায়েন্স। তারা বিবৃতিতে বলেন, একেএইচ লজিস্টিকস পরিবেশ, কৃষি ও জলবায়ুর যে পরিমাণ ক্ষতি করেছে তা ১০০ কোটি টাকারও বেশি। এখানে জরিমানা কম হওয়ায় অপরাধী অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে অনুৎসাহী হবে। জরিমানার পরিমাণ ও জেল বেশি হলে অপরাধ কমবে বলে দাবি করেন তারা। বিবৃতিতে তারা আরও বলেন, এ একেএইচ লজিস্টিকসকে স্হায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে এবং মালিককে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দ্রুত এ বিষয় নিয়ে প্রশাসন কঠোর না হলে গ্রীন চট্টগ্রাম এ্যালায়েন্স বিভিন্ন কর্মসূচী ঘোষণা করতে বাধ্য হবে।

আপনার মতামত লিখুন