মনপুরার চারপাশে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও কার্পেটিং রাস্তা বহালের দাবি মনপুরাবাসীর
মুহাঃ আশরাফুল ইসলামমনপুরা উপজেলা প্রতিনিধি:- ভোলা জেলার দ্বীপ উপজেলা মনপুরা দীর্ঘদিন ধরে প্রমত্তা মেঘনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনের শিকার হয়ে আসছে। নদীভাঙনের ফলে উপজেলার মূল ভূখণ্ড প্রতিবছরই ছোট হয়ে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বহু পরিবার বসতভিটা হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়েছে। এছাড়া হাজার কোটি টাকার সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
এই দুর্ভোগ থেকে মনপুরাবাসীকে রক্ষা করতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে “ভোলা জেলার মুজিবনগর এবং মনপুরা উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও তীর সংরক্ষণ” শীর্ষক একটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রায় ১,১১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের আওতায় মনপুরা উপজেলার চারপাশে নদীভাঙন রোধে জিওব্যাগ ও জিওটিউব ডাম্পিংয়ের মাধ্যমে নদীতীর সংরক্ষণ কাজ চলছে।
প্রকল্পের আওতায় মনপুরা দ্বীপের চারদিকে প্রায় ৫১ কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং ১১টি স্লুইজগেট স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে নির্মাণকাজ দৃশ্যমান হওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।
তবে বেড়িবাঁধের উপর কার্পেটিং (পিচঢালাই রাস্তা), সোলার লাইট স্থাপন এবং ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ নিয়ে দেখা দিয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।
জানা গেছে, পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পের প্রাথমিক নকশা ও ডিপিপিতে বেড়িবাঁধের উপর ৫১ কিলোমিটার কার্পেটিং রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। এর মাধ্যমে পুরো বাঁধকে একটি আধুনিক মেরিন ড্রাইভে রূপান্তরের চিন্তাও করা হয়েছিল। এ লক্ষ্যে দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদারও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর মনপুরা দ্বীপের দক্ষিণ অংশজুড়ে রয়েছে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। সেখানে হরিণসহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের বসবাস। বিকেলের সোনালি আলোয় নদীর ঢেউয়ের শব্দ ও পাখির কিচিরমিচির পর্যটকদের মুগ্ধ করে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা গেলে মনপুরা দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
কিন্তু ব্যয় সাশ্রয়ের অজুহাতে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বেড়িবাঁধের কার্পেটিং, সোলার লাইট এবং ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ কাজ স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা যায়। এ সিদ্ধান্তে স্থানীয় জনগণের মাঝে চরম হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, টেকসই বাঁধের উপর কার্পেটিং করা হলে একদিকে যেমন বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে এবং পর্যটন শিল্পেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চরফ্যাশন ও মনপুরার সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নয়ন পানি সম্পদ মন্ত্রীর কাছে ডিও লেটারের মাধ্যমে বাঁধের উপর কার্পেটিং, সোলার লাইট ও ওয়াচ টাওয়ার অনুমোদিত ডিজাইন অনুযায়ী বহাল রেখে বাস্তবায়নের অনুরোধ জানান।
এরই প্রেক্ষিতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। গত ২০ জুন কমিটির সদস্যরা সরেজমিনে মনপুরা এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সাধারণ জনগণ উপস্থিত থেকে বেড়িবাঁধে কার্পেটিং কাজ বহাল রাখার জোর দাবি জানান।
পরিদর্শনকালে কমিটির আহ্বায়ক, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী (ডিজাইন), ঢাকা এলাকাবাসীকে কার্পেটিং বহাল রাখার বিষয়ে আশ্বস্ত করেন। এসময় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, বাজেট বরাদ্দ, প্রকল্প অনুমোদন, কাজের সূচনা এবং সংসদ সদস্যের সুপারিশের পরও কেন কার্পেটিং বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে, তা তাদের বোধগম্য নয়। স্থানীয়দের দাবি, বিস্তারিত সমীক্ষা ও যাচাই-বাছাই শেষে এই কার্পেটিং কাজ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল এবং তা একনেক সভায়ও অনুমোদন পেয়েছে।
মনপুরাবাসীর একটাই প্রত্যাশা—নদীভাঙন থেকে স্থায়ী সুরক্ষা, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশের স্বার্থে অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্পেটিংসহ পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হোক।

রোববার, ২১ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুন ২০২৬
মনপুরার চারপাশে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও কার্পেটিং রাস্তা বহালের দাবি মনপুরাবাসীর
মুহাঃ আশরাফুল ইসলামমনপুরা উপজেলা প্রতিনিধি:- ভোলা জেলার দ্বীপ উপজেলা মনপুরা দীর্ঘদিন ধরে প্রমত্তা মেঘনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনের শিকার হয়ে আসছে। নদীভাঙনের ফলে উপজেলার মূল ভূখণ্ড প্রতিবছরই ছোট হয়ে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বহু পরিবার বসতভিটা হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়েছে। এছাড়া হাজার কোটি টাকার সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
শুধু নদীভাঙনই নয়, টেকসই বেড়িবাঁধ না থাকায় প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের পানিতে মনপুরার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার সময় লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে জীবিকা হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয় লাখো মানুষকে।
এই দুর্ভোগ থেকে মনপুরাবাসীকে রক্ষা করতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে “ভোলা জেলার মুজিবনগর এবং মনপুরা উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও তীর সংরক্ষণ” শীর্ষক একটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রায় ১,১১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের আওতায় মনপুরা উপজেলার চারপাশে নদীভাঙন রোধে জিওব্যাগ ও জিওটিউব ডাম্পিংয়ের মাধ্যমে নদীতীর সংরক্ষণ কাজ চলছে।
প্রকল্পের আওতায় মনপুরা দ্বীপের চারদিকে প্রায় ৫১ কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং ১১টি স্লুইজগেট স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে নির্মাণকাজ দৃশ্যমান হওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।
তবে বেড়িবাঁধের উপর কার্পেটিং (পিচঢালাই রাস্তা), সোলার লাইট স্থাপন এবং ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ নিয়ে দেখা দিয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।
জানা গেছে, পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পের প্রাথমিক নকশা ও ডিপিপিতে বেড়িবাঁধের উপর ৫১ কিলোমিটার কার্পেটিং রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। এর মাধ্যমে পুরো বাঁধকে একটি আধুনিক মেরিন ড্রাইভে রূপান্তরের চিন্তাও করা হয়েছিল। এ লক্ষ্যে দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদারও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর মনপুরা দ্বীপের দক্ষিণ অংশজুড়ে রয়েছে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। সেখানে হরিণসহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের বসবাস। বিকেলের সোনালি আলোয় নদীর ঢেউয়ের শব্দ ও পাখির কিচিরমিচির পর্যটকদের মুগ্ধ করে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা গেলে মনপুরা দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
কিন্তু ব্যয় সাশ্রয়ের অজুহাতে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বেড়িবাঁধের কার্পেটিং, সোলার লাইট এবং ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ কাজ স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা যায়। এ সিদ্ধান্তে স্থানীয় জনগণের মাঝে চরম হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, টেকসই বাঁধের উপর কার্পেটিং করা হলে একদিকে যেমন বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে এবং পর্যটন শিল্পেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চরফ্যাশন ও মনপুরার সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নয়ন পানি সম্পদ মন্ত্রীর কাছে ডিও লেটারের মাধ্যমে বাঁধের উপর কার্পেটিং, সোলার লাইট ও ওয়াচ টাওয়ার অনুমোদিত ডিজাইন অনুযায়ী বহাল রেখে বাস্তবায়নের অনুরোধ জানান।
এরই প্রেক্ষিতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। গত ২০ জুন কমিটির সদস্যরা সরেজমিনে মনপুরা এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সাধারণ জনগণ উপস্থিত থেকে বেড়িবাঁধে কার্পেটিং কাজ বহাল রাখার জোর দাবি জানান।
পরিদর্শনকালে কমিটির আহ্বায়ক, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী (ডিজাইন), ঢাকা এলাকাবাসীকে কার্পেটিং বহাল রাখার বিষয়ে আশ্বস্ত করেন। এসময় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, বাজেট বরাদ্দ, প্রকল্প অনুমোদন, কাজের সূচনা এবং সংসদ সদস্যের সুপারিশের পরও কেন কার্পেটিং বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে, তা তাদের বোধগম্য নয়। স্থানীয়দের দাবি, বিস্তারিত সমীক্ষা ও যাচাই-বাছাই শেষে এই কার্পেটিং কাজ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল এবং তা একনেক সভায়ও অনুমোদন পেয়েছে।
মনপুরাবাসীর একটাই প্রত্যাশা—নদীভাঙন থেকে স্থায়ী সুরক্ষা, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশের স্বার্থে অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্পেটিংসহ পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হোক।

আপনার মতামত লিখুন