দুই সন্তানসহ বিধবা নারীকে বিয়ে করায় এলাকা ছাড়া নবদম্পতি, থানায় অভিযোগ
সরিষাবাড়ী (জামালপুর) প্রতিনিধি:- একজন বিধবা নারী, দুই পিতৃহীন সন্তান আর একজন মানুষের মানবিক সিদ্ধান্ত—এই তিনটি যেন একসঙ্গে মিশে তৈরি করেছে এক বেদনাদায়ক বাস্তবতার গল্প। স্বামীহারা এক নারী ও তাঁর দুই সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে তাঁকে বিয়ে করেছেন শফিকুল ইসলাম মোল্লা (৫১)। ধর্মীয় ও আইনগত রীতি মেনে করা সেই বিয়ের পরই শুরু হয় নানা চাপ, ভয়ভীতি ও হুমকি। শেষ পর্যন্ত জীবন ও নিরাপত্তার শঙ্কায় নবদম্পতিকে নিয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে চুরির অপবাদ দিয়ে থানায় মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তাঁর দাবি, মানবিক কারণে বিধবা নারীকে বিয়ে করার বিষয়টি মেনে নিতে না পেরে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মাতব্বর তাঁকে হয়রানি করতে এই অভিযোগ করিয়েছেন। শুধু তাই নয়, বিয়েতে সহযোগিতা করার অভিযোগ এনে তাঁর চাচাতো ভাই হাফিজ উদ্দিন মোল্লাকেও সামাজিকভাবে একঘরে করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
এ ঘটনাটি জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার ডোয়াইল ইউনিয়নের হাটবাড়ী গ্রামে ঘটেছে। এ ঘটনায় নিরাপত্তা ও বিচার চেয়ে শফিকুল ইসলাম গত ১১ আগস্ট সরিষাবাড়ী থানায় শাহজাহান মোল্লাকে প্রধান বিবাদী করে অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ জনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগটি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে হাটবাড়ী এলাকার শাহজাহান মোল্লার ছেলে মারা যান। স্বামী হারানোর পর দুই সন্তানকে নিয়ে চরম অসহায় অবস্থায় দিন কাটছিল ঝর্ণা আক্তারের। স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর অসহায়ত্ব দেখে সামাজিকভাবে পাশে দাঁড়ানো এবং দুই সন্তানের দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন নিহত স্বামীর দূরসম্পর্কের চাচা শফিকুল ইসলাম। পরে ধর্মীয় ও আইনগত রীতি মেনে তাঁদের বিয়ে হয়।
কিন্তু এই বিয়ে সহজভাবে মেনে নেয়নি স্থানীয় কিছু ব্যক্তি। অভিযোগ রয়েছে, বিয়ের পর থেকেই নবদম্পতিকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ ও ভয়ভীতি দেখানো হয়। একপর্যায়ে শফিকুলের বিরুদ্ধে চুরির অপবাদ দিয়ে থানায় মিথ্যা অভিযোগে দায়ের করা হয়। শফিকুলের দাবি, অভিযোগটি বানোয়াট এবং তাঁকে সামাজিক ও মানসিকভাবে চাপে রাখার এবং হয়রানির উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে।
ঘটনার আরও ভয়াবহ দিক উঠে এসেছে শফিকুলের থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে। এতে বলা হয়, গত ১৫ জুলাই সকালে শাহজাহান মোল্লাসহ ৪-৫ জন ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে তাঁর বসতবাড়িতে যান। সেখানে গালিগালাজ ও মারধরের চেষ্টা করা হলে তিনি ঘরে ঢুকে আত্মরক্ষা করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তাঁকে খুন-জখম, জমি দখল, পুকুরের মাছ নিধন এবং বিষ প্রয়োগ করে ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগের পর থেকেই শফিকুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং জীবন বাঁচাতে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানান শফিকুল।
শফিকুল ইসলাম বলেন, “একজন অসহায় বিধবা নারী ও তাঁর দুই পিতৃহীন সন্তানের দায়িত্ব নেওয়া কি আমার অপরাধ? আমি ধর্ম ও আইন মেনে বিয়ে করেছি। অথচ এই বিয়েকে কেন্দ্র করে আমাকে চুরির অপবাদ দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। এখন পরিবার নিয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি। নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কায় আছি।”
অন্যদিকে ঝর্ণা আক্তার আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে প্রায় দুই বছর অত্যন্ত কষ্টে দিন কাটিয়েছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, শ্বশুর জীবিত থাকলেও নাতিদের তেমন খোঁজখবর নিতেন না । তাঁর ভাষায়, “এখন একজন মানুষ আমাকে ও আমার সন্তানদের আশ্রয় দিয়েছেন। আমরা বাঁচতে চাই। কিন্তু আমাদের বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও যেন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।”
শফিকুলের আরও অভিযোগ, বিয়েতে সহযোগিতা করার মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তাঁর চাচাতো ভাই হাফিজ উদ্দিন মোল্লাকেও সামাজিকভাবে একঘরে করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে ক্ষোভ ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে শাহজাহান মোল্লার বক্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
জানতে চাইলে সরিষাবাড়ী থানার এসআই শাহীন মিয়া বলেন, “শফিকুল ইসলাম একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহল মন্তব্য করেন যে, একজন অসহায় বিধবা নারী ও তাঁর দুই সন্তানের পাশে দাঁড়ানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে যদি সত্যিই ভয়ভীতি, সামাজিক চাপ কিংবা হয়রানির ঘটনা ঘটে থাকে, তবে তা শুধু একটি পরিবারের বিষয় নয়—এটি সমাজের মানবিক মূল্যবোধ ও নারীর নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলে। অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং নিরপরাধ কেউ হয়রানির শিকার হলে তাঁর সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ আগস্ট ২০২৬
দুই সন্তানসহ বিধবা নারীকে বিয়ে করায় এলাকা ছাড়া নবদম্পতি, থানায় অভিযোগ
সরিষাবাড়ী (জামালপুর) প্রতিনিধি:- একজন বিধবা নারী, দুই পিতৃহীন সন্তান আর একজন মানুষের মানবিক সিদ্ধান্ত—এই তিনটি যেন একসঙ্গে মিশে তৈরি করেছে এক বেদনাদায়ক বাস্তবতার গল্প। স্বামীহারা এক নারী ও তাঁর দুই সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে তাঁকে বিয়ে করেছেন শফিকুল ইসলাম মোল্লা (৫১)। ধর্মীয় ও আইনগত রীতি মেনে করা সেই বিয়ের পরই শুরু হয় নানা চাপ, ভয়ভীতি ও হুমকি। শেষ পর্যন্ত জীবন ও নিরাপত্তার শঙ্কায় নবদম্পতিকে নিয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে চুরির অপবাদ দিয়ে থানায় মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তাঁর দাবি, মানবিক কারণে বিধবা নারীকে বিয়ে করার বিষয়টি মেনে নিতে না পেরে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মাতব্বর তাঁকে হয়রানি করতে এই অভিযোগ করিয়েছেন। শুধু তাই নয়, বিয়েতে সহযোগিতা করার অভিযোগ এনে তাঁর চাচাতো ভাই হাফিজ উদ্দিন মোল্লাকেও সামাজিকভাবে একঘরে করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
এ ঘটনাটি জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার ডোয়াইল ইউনিয়নের হাটবাড়ী গ্রামে ঘটেছে। এ ঘটনায় নিরাপত্তা ও বিচার চেয়ে শফিকুল ইসলাম গত ১১ আগস্ট সরিষাবাড়ী থানায় শাহজাহান মোল্লাকে প্রধান বিবাদী করে অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ জনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগটি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে হাটবাড়ী এলাকার শাহজাহান মোল্লার ছেলে মারা যান। স্বামী হারানোর পর দুই সন্তানকে নিয়ে চরম অসহায় অবস্থায় দিন কাটছিল ঝর্ণা আক্তারের। স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর অসহায়ত্ব দেখে সামাজিকভাবে পাশে দাঁড়ানো এবং দুই সন্তানের দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন নিহত স্বামীর দূরসম্পর্কের চাচা শফিকুল ইসলাম। পরে ধর্মীয় ও আইনগত রীতি মেনে তাঁদের বিয়ে হয়।
কিন্তু এই বিয়ে সহজভাবে মেনে নেয়নি স্থানীয় কিছু ব্যক্তি। অভিযোগ রয়েছে, বিয়ের পর থেকেই নবদম্পতিকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ ও ভয়ভীতি দেখানো হয়। একপর্যায়ে শফিকুলের বিরুদ্ধে চুরির অপবাদ দিয়ে থানায় মিথ্যা অভিযোগে দায়ের করা হয়। শফিকুলের দাবি, অভিযোগটি বানোয়াট এবং তাঁকে সামাজিক ও মানসিকভাবে চাপে রাখার এবং হয়রানির উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে।
ঘটনার আরও ভয়াবহ দিক উঠে এসেছে শফিকুলের থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে। এতে বলা হয়, গত ১৫ জুলাই সকালে শাহজাহান মোল্লাসহ ৪-৫ জন ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে তাঁর বসতবাড়িতে যান। সেখানে গালিগালাজ ও মারধরের চেষ্টা করা হলে তিনি ঘরে ঢুকে আত্মরক্ষা করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তাঁকে খুন-জখম, জমি দখল, পুকুরের মাছ নিধন এবং বিষ প্রয়োগ করে ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগের পর থেকেই শফিকুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং জীবন বাঁচাতে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানান শফিকুল।
শফিকুল ইসলাম বলেন, “একজন অসহায় বিধবা নারী ও তাঁর দুই পিতৃহীন সন্তানের দায়িত্ব নেওয়া কি আমার অপরাধ? আমি ধর্ম ও আইন মেনে বিয়ে করেছি। অথচ এই বিয়েকে কেন্দ্র করে আমাকে চুরির অপবাদ দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। এখন পরিবার নিয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি। নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কায় আছি।”
অন্যদিকে ঝর্ণা আক্তার আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে প্রায় দুই বছর অত্যন্ত কষ্টে দিন কাটিয়েছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, শ্বশুর জীবিত থাকলেও নাতিদের তেমন খোঁজখবর নিতেন না । তাঁর ভাষায়, “এখন একজন মানুষ আমাকে ও আমার সন্তানদের আশ্রয় দিয়েছেন। আমরা বাঁচতে চাই। কিন্তু আমাদের বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও যেন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।”
শফিকুলের আরও অভিযোগ, বিয়েতে সহযোগিতা করার মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তাঁর চাচাতো ভাই হাফিজ উদ্দিন মোল্লাকেও সামাজিকভাবে একঘরে করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে ক্ষোভ ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে শাহজাহান মোল্লার বক্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
জানতে চাইলে সরিষাবাড়ী থানার এসআই শাহীন মিয়া বলেন, “শফিকুল ইসলাম একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহল মন্তব্য করেন যে, একজন অসহায় বিধবা নারী ও তাঁর দুই সন্তানের পাশে দাঁড়ানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে যদি সত্যিই ভয়ভীতি, সামাজিক চাপ কিংবা হয়রানির ঘটনা ঘটে থাকে, তবে তা শুধু একটি পরিবারের বিষয় নয়—এটি সমাজের মানবিক মূল্যবোধ ও নারীর নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলে। অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং নিরপরাধ কেউ হয়রানির শিকার হলে তাঁর সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

আপনার মতামত লিখুন