রাজ্যের সুন্দরবন বিষয়ক এবং ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের মন্ত্রী দীপঙ্কর জানা ও বিশিষ্ট ব্যাক্তিদের উপস্থিতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সংকটে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাকদ্বীপে গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়া ওয়ার্কশপ।
মোমিন আলি লস্কর, জয়নগর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা কাকদ্বীপ, ২৯ আগস্ট: সুন্দরবনের জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত বিপন্নতা এবং সেই সংকটকে সাংবাদিকতার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরার লক্ষ্যে কাকদ্বীপে অনুষ্ঠিত হল গুরুত্বপূর্ণ এক মিডিয়া ওয়ার্কশপ। আন্তর্জাতিক সংস্থা UNICEF-এর উদ্যোগে এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ সাংবাদিক, সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং লেকচারার ডাঃ জয়ন্ত বসুর সহযোগিতা ও পরিকল্পনায় শনিবার কাকদ্বীপ বিডিও অফিসের কনফারেন্স হলে এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়।সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ অরণ্য ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান অভিঘাতে এই অঞ্চল বর্তমানে একাধিক ঝুঁকির মুখে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর বাড়তে থাকা চাপ সব মিলিয়ে সুন্দরবনের পরিবেশ ও উপকূলবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ। জলবায়ু পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক তথ্য, উপকূলবাসীর অভিজ্ঞতা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্রকে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কর্মশালায় বিস্তারিত আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন রাজ্যের সুন্দরবন বিষয়ক এবং ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী দীপঙ্কর জানা। তিনি সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষা, উপকূলবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের সমস্যা, তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও পরিবেশগত সংকটকে নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও কর্মশালায় উঠে আসে। সাংবাদিকতার ওপর জোর
কর্মশালায় UNICEF-এর প্রতিনিধিদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ ও সুন্দরবন বিষয়ক বিশিষ্ট সাংবাদিক, গবেষক এবং বিশেষজ্ঞরা। সুন্দরবনের জলবায়ু বিপন্নতা নিয়ে কীভাবে তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরি করা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবন ও জীবিকার সম্পর্ক কীভাবে তুলে ধরা যায় এবং পরিবেশগত বিষয়কে সংবাদমাধ্যমে আরও গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করা যায় এসব বিষয় নিয়ে মতবিনিময় হয়।
বিশেষভাবে সুন্দরবনের নদীভাঙন, লবণাক্ততা, কৃষির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, মৎস্যজীবীদের সমস্যা, বন ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ এবং উপকূলবাসীর ভবিষ্যৎ নিয়ে সাংবাদিকদের আরও গভীরভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
একই সঙ্গে জলবায়ু সংক্রান্ত খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্যের নির্ভুলতা, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এবং সাধারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। কর্মশালায় সাংবাদিকদের উদ্দেশে ডাঃ জয়ন্ত বসু বলেন, সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলের জলবায়ু সংকটকে শুধুমাত্র দুর্যোগের খবর হিসেবে দেখলে হবে না। এর সঙ্গে পরিবেশ, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, জীবিকা, অভিবাসন এবং মানুষের ভবিষ্যৎ গভীরভাবে জড়িত।
তাঁর মতে, আগামী দিনে সুন্দরবন নিয়ে সাংবাদিকতাকে আরও তথ্যনির্ভর, অনুসন্ধানমূলক ও জনমুখী করে তোলা প্রয়োজন।সাংবাদিকের অংশগ্রহণ কর্মশালায় সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সীমিত সংখ্যক সাংবাদিক অংশগ্রহণ করেন। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন থাকায় পূর্বনির্ধারিত ও নিশ্চিত অংশগ্রহণকারীরাই কর্মশালায় যোগ দেওয়ার সুযোগ পান।সুন্দরবন অঞ্চলটি ঘূর্নিঝড় -প্রবন, মৌসুমি বায়ুর দ্বারা প্রভাবিত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা খুবই কম হওয়ায় জলবায়ুর সামান্য তম পরিবর্তন সুন্দরবনের জীব প্রজাতি, বাস্তুতন্ত্র ও মানুষের উপর গভীর প্রভাব ফেলে।জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটছে, যার ফল স্বরূপ গ্রিনল্যান্ড ও আন্টার্কটিকার প্রচুর পরিমানে বরফ গলে গিয়ে সমুদ্র জলের উচ্চতার বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। যার ফলে সুন্দরবনের নিচু দ্বীপ গুলি সমুদ্র তলদেশে নিমজ্জিত হয়ে পড়ছে। যা ফলে সুন্দরবনের আয়তন ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
সমুদ্র জলের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সুন্দরবন ক্রমশ নিমজ্জিত হচ্ছে বলে বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রানিরা তাদের বাসস্থান হারিয়ে ফেলছে, পরিবর্তিত জলবায়ুর সাথে অনেক জীব প্রজাতি মানিয়ে নিতে না চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে এবং সমুদ্র জলের উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সুন্দরবনের বহু জলজ প্রানী আজ ক্রমশ বিলুপ্তির পথে অগ্রসর হচ্ছে। অর্থাৎ সুন্দরবনের জীবপ্রজাতির বৈচিত্র্যে হ্রাসে জলবায়ু পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে সুন্দরবন অঞ্চলের সামুদ্রিক খাঁড়ি গুলি লবনতা ও উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন মৎস্য প্রজাতি এই পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে পারছে না। তাই মৎস্য প্রজাতি গুলির প্রজনন ক্ষমতা কমে গিয়ে মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।হিমবাহের গলনের ফলে সমুদ্র জলের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ঝড় কিংবা জোয়ারের সময় অতি সহজেই সমুদ্রের জল সুন্দরবন অঞ্চলে প্রবেশ করে সেখানকার বিস্তৃর্ন অঞ্চল কে প্লাবিত করে মনুষ্য জীবন যাত্রাকে ব্যাহত করে দেয়। কৃষি জমি গুলিকে লবনাক্ত করে তুলে।সুন্দরবন বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত এবং এই অঞ্চল টি পৃথিবীর অন্যতম প্রধান ঘূর্নিঝড় প্রবন এলাকা। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় সমুদ্রের জল অতি সহজেই উত্তপ্ত হয়ে ঝড় সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করছে বলে, এই অঞ্চলে ঘূর্নিঝর সৃষ্টির প্রবনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ঝড় গুলির প্রবল আঘাতে সুন্দরবনের প্রচুর গাছপালা ভেঙে পড়ছে, বহু প্রানী মারা যাচ্ছে, জলোচ্ছ্বাসের ফলে বহু এলাকা প্লাবিত হচ্ছে এবং সঙ্গে সঙ্গে সুন্দরবন অঞ্চলে বসবাসকারী বহু মানুষের প্রানহানি ঘটছে ও প্রচুর অর্থনৈতিক ক্ষয় ক্ষতির প্রবনতা বাড়ছে।
জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটছে, যার ফল স্বরূপ গ্রিনল্যান্ড ও আন্টার্কটিকার প্রচুর পরিমানে বরফ গলে গিয়ে সমুদ্র জলের উচ্চতার বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। যার ফলে সুন্দরবনের নিচু দ্বীপ গুলি সমুদ্র তলদেশে নিমজ্জিত হয়ে পড়ছে।সুন্দরবনের জলবায়ু সংকটকে আরও গভীরভাবে বোঝা এবং সেই সংকটের বাস্তব চিত্র মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই কর্মশালা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
সাংবাদিকতা যদি মানুষের কণ্ঠস্বর হয়, তাহলে জলবায়ু বিপন্ন সুন্দরবনের মানুষের কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করে তোলাই হতে পারে আগামী দিনের পরিবেশ সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সুন্দরবন বাঁচলে বাঁচবে উপকূল, বাঁচবে মানুষ।
আগামী প্রজন্মের জন্য প্রকৃতি রক্ষার আহ্বান পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে স্পষ্ট সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।বন, নদী, জলাভূমি, দেশীয় উদ্ভিদ, পাখি, মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
উপকূলের সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে তাই জোরালো দাবি উঠেছে “সারা বিশ্বে সকল জীববৈচিত্র্য, প্রাণবৈচিত্র্য ও উদ্ভিদবৈচিত্র্যকে বাঁচাও, বাঁচতে দাও এই নীতিতে অটল থাকতে হবে।”সুন্দরবনের জলবায়ু বিপন্নতা তুলে ধরতে এবং তা মোকাবিলায় একজন সাংবাদিকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমুখী। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সুন্দরবন আজ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘন ঘন তীব্র ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং দ্বীপ ক্ষয়ের মতো মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি।
সুন্দরবনের জলবায়ু সংকটে ঝড়, বন্যা বা নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় মানুষের বাস্তব চিত্র সরাসরি গণমাধ্যমে মানবিক গল্প জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কীভাবে মানুষ ভিটেমাটি হারাচ্ছে, 'জলবায়ু শরণার্থী' হচ্ছে এবং তাদের জীবিকা ধ্বংস হচ্ছে, তা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ফুটিয়ে তোলা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কুপেয় পানির অভাবে উপকূলীয় নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অতিরিক্ত কষ্টের কথা সামনে আনা।স্থানীয় জনগণকে আসন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জোয়ারের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করা। লবণাক্ততা-সহনশীল ফসল চাষ বা দুর্যোগকালীন প্রস্তুতি সংক্রান্ত সফল উদ্যোগগুলো প্রচার করে স্থানীয়দের উৎসাহিত করা। আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে (যেমন COP) সুন্দরবনের সংকট তুলে ধরে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ বা 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ' ফান্ডের দাবি জোরালো করা।

রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬
রাজ্যের সুন্দরবন বিষয়ক এবং ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের মন্ত্রী দীপঙ্কর জানা ও বিশিষ্ট ব্যাক্তিদের উপস্থিতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সংকটে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাকদ্বীপে গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়া ওয়ার্কশপ।
মোমিন আলি লস্কর, জয়নগর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা কাকদ্বীপ, ২৯ আগস্ট: সুন্দরবনের জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত বিপন্নতা এবং সেই সংকটকে সাংবাদিকতার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরার লক্ষ্যে কাকদ্বীপে অনুষ্ঠিত হল গুরুত্বপূর্ণ এক মিডিয়া ওয়ার্কশপ। আন্তর্জাতিক সংস্থা UNICEF-এর উদ্যোগে এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ সাংবাদিক, সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং লেকচারার ডাঃ জয়ন্ত বসুর সহযোগিতা ও পরিকল্পনায় শনিবার কাকদ্বীপ বিডিও অফিসের কনফারেন্স হলে এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়।সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ অরণ্য ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান অভিঘাতে এই অঞ্চল বর্তমানে একাধিক ঝুঁকির মুখে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর বাড়তে থাকা চাপ সব মিলিয়ে সুন্দরবনের পরিবেশ ও উপকূলবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ। জলবায়ু পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক তথ্য, উপকূলবাসীর অভিজ্ঞতা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্রকে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কর্মশালায় বিস্তারিত আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন রাজ্যের সুন্দরবন বিষয়ক এবং ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী দীপঙ্কর জানা। তিনি সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষা, উপকূলবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের সমস্যা, তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও পরিবেশগত সংকটকে নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও কর্মশালায় উঠে আসে। সাংবাদিকতার ওপর জোর
কর্মশালায় UNICEF-এর প্রতিনিধিদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ ও সুন্দরবন বিষয়ক বিশিষ্ট সাংবাদিক, গবেষক এবং বিশেষজ্ঞরা। সুন্দরবনের জলবায়ু বিপন্নতা নিয়ে কীভাবে তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরি করা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবন ও জীবিকার সম্পর্ক কীভাবে তুলে ধরা যায় এবং পরিবেশগত বিষয়কে সংবাদমাধ্যমে আরও গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করা যায় এসব বিষয় নিয়ে মতবিনিময় হয়।
বিশেষভাবে সুন্দরবনের নদীভাঙন, লবণাক্ততা, কৃষির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, মৎস্যজীবীদের সমস্যা, বন ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ এবং উপকূলবাসীর ভবিষ্যৎ নিয়ে সাংবাদিকদের আরও গভীরভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
একই সঙ্গে জলবায়ু সংক্রান্ত খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্যের নির্ভুলতা, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এবং সাধারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। কর্মশালায় সাংবাদিকদের উদ্দেশে ডাঃ জয়ন্ত বসু বলেন, সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলের জলবায়ু সংকটকে শুধুমাত্র দুর্যোগের খবর হিসেবে দেখলে হবে না। এর সঙ্গে পরিবেশ, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, জীবিকা, অভিবাসন এবং মানুষের ভবিষ্যৎ গভীরভাবে জড়িত।
তাঁর মতে, আগামী দিনে সুন্দরবন নিয়ে সাংবাদিকতাকে আরও তথ্যনির্ভর, অনুসন্ধানমূলক ও জনমুখী করে তোলা প্রয়োজন।সাংবাদিকের অংশগ্রহণ কর্মশালায় সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সীমিত সংখ্যক সাংবাদিক অংশগ্রহণ করেন। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন থাকায় পূর্বনির্ধারিত ও নিশ্চিত অংশগ্রহণকারীরাই কর্মশালায় যোগ দেওয়ার সুযোগ পান।সুন্দরবন অঞ্চলটি ঘূর্নিঝড় -প্রবন, মৌসুমি বায়ুর দ্বারা প্রভাবিত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা খুবই কম হওয়ায় জলবায়ুর সামান্য তম পরিবর্তন সুন্দরবনের জীব প্রজাতি, বাস্তুতন্ত্র ও মানুষের উপর গভীর প্রভাব ফেলে।জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটছে, যার ফল স্বরূপ গ্রিনল্যান্ড ও আন্টার্কটিকার প্রচুর পরিমানে বরফ গলে গিয়ে সমুদ্র জলের উচ্চতার বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। যার ফলে সুন্দরবনের নিচু দ্বীপ গুলি সমুদ্র তলদেশে নিমজ্জিত হয়ে পড়ছে। যা ফলে সুন্দরবনের আয়তন ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
সমুদ্র জলের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সুন্দরবন ক্রমশ নিমজ্জিত হচ্ছে বলে বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রানিরা তাদের বাসস্থান হারিয়ে ফেলছে, পরিবর্তিত জলবায়ুর সাথে অনেক জীব প্রজাতি মানিয়ে নিতে না চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে এবং সমুদ্র জলের উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সুন্দরবনের বহু জলজ প্রানী আজ ক্রমশ বিলুপ্তির পথে অগ্রসর হচ্ছে। অর্থাৎ সুন্দরবনের জীবপ্রজাতির বৈচিত্র্যে হ্রাসে জলবায়ু পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে সুন্দরবন অঞ্চলের সামুদ্রিক খাঁড়ি গুলি লবনতা ও উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন মৎস্য প্রজাতি এই পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে পারছে না। তাই মৎস্য প্রজাতি গুলির প্রজনন ক্ষমতা কমে গিয়ে মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।হিমবাহের গলনের ফলে সমুদ্র জলের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ঝড় কিংবা জোয়ারের সময় অতি সহজেই সমুদ্রের জল সুন্দরবন অঞ্চলে প্রবেশ করে সেখানকার বিস্তৃর্ন অঞ্চল কে প্লাবিত করে মনুষ্য জীবন যাত্রাকে ব্যাহত করে দেয়। কৃষি জমি গুলিকে লবনাক্ত করে তুলে।সুন্দরবন বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত এবং এই অঞ্চল টি পৃথিবীর অন্যতম প্রধান ঘূর্নিঝড় প্রবন এলাকা। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় সমুদ্রের জল অতি সহজেই উত্তপ্ত হয়ে ঝড় সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করছে বলে, এই অঞ্চলে ঘূর্নিঝর সৃষ্টির প্রবনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ঝড় গুলির প্রবল আঘাতে সুন্দরবনের প্রচুর গাছপালা ভেঙে পড়ছে, বহু প্রানী মারা যাচ্ছে, জলোচ্ছ্বাসের ফলে বহু এলাকা প্লাবিত হচ্ছে এবং সঙ্গে সঙ্গে সুন্দরবন অঞ্চলে বসবাসকারী বহু মানুষের প্রানহানি ঘটছে ও প্রচুর অর্থনৈতিক ক্ষয় ক্ষতির প্রবনতা বাড়ছে।
জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটছে, যার ফল স্বরূপ গ্রিনল্যান্ড ও আন্টার্কটিকার প্রচুর পরিমানে বরফ গলে গিয়ে সমুদ্র জলের উচ্চতার বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। যার ফলে সুন্দরবনের নিচু দ্বীপ গুলি সমুদ্র তলদেশে নিমজ্জিত হয়ে পড়ছে।সুন্দরবনের জলবায়ু সংকটকে আরও গভীরভাবে বোঝা এবং সেই সংকটের বাস্তব চিত্র মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই কর্মশালা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
সাংবাদিকতা যদি মানুষের কণ্ঠস্বর হয়, তাহলে জলবায়ু বিপন্ন সুন্দরবনের মানুষের কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করে তোলাই হতে পারে আগামী দিনের পরিবেশ সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সুন্দরবন বাঁচলে বাঁচবে উপকূল, বাঁচবে মানুষ।
আগামী প্রজন্মের জন্য প্রকৃতি রক্ষার আহ্বান পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে স্পষ্ট সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।বন, নদী, জলাভূমি, দেশীয় উদ্ভিদ, পাখি, মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
উপকূলের সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে তাই জোরালো দাবি উঠেছে “সারা বিশ্বে সকল জীববৈচিত্র্য, প্রাণবৈচিত্র্য ও উদ্ভিদবৈচিত্র্যকে বাঁচাও, বাঁচতে দাও এই নীতিতে অটল থাকতে হবে।”সুন্দরবনের জলবায়ু বিপন্নতা তুলে ধরতে এবং তা মোকাবিলায় একজন সাংবাদিকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমুখী। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সুন্দরবন আজ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘন ঘন তীব্র ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং দ্বীপ ক্ষয়ের মতো মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি।
সুন্দরবনের জলবায়ু সংকটে ঝড়, বন্যা বা নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় মানুষের বাস্তব চিত্র সরাসরি গণমাধ্যমে মানবিক গল্প জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কীভাবে মানুষ ভিটেমাটি হারাচ্ছে, 'জলবায়ু শরণার্থী' হচ্ছে এবং তাদের জীবিকা ধ্বংস হচ্ছে, তা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ফুটিয়ে তোলা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কুপেয় পানির অভাবে উপকূলীয় নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অতিরিক্ত কষ্টের কথা সামনে আনা।স্থানীয় জনগণকে আসন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জোয়ারের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করা। লবণাক্ততা-সহনশীল ফসল চাষ বা দুর্যোগকালীন প্রস্তুতি সংক্রান্ত সফল উদ্যোগগুলো প্রচার করে স্থানীয়দের উৎসাহিত করা। আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে (যেমন COP) সুন্দরবনের সংকট তুলে ধরে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ বা 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ' ফান্ডের দাবি জোরালো করা।

আপনার মতামত লিখুন