ডেইলি বাংল সংবাদ
প্রকাশ : সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

দর্শক তৈরির পাঠশালা, দেশ-বিদেশে হাসির চার দশক।

দর্শক তৈরির পাঠশালা, দেশ-বিদেশে হাসির চার দশক।

দর্শক তৈরির পাঠশালা, দেশ-বিদেশে হাসির চার দশক।

বিশেষ প্রতিনিধি:- মঞ্চ নাটকের দর্শক তৈরিতে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে যে হাতে গোনা কয়েকটি প্রযোজনা অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছে, তার মধ্যে অগ্রগণ্য নাম লোকনাট্য দলের ‘কঞ্জুস’। ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের আয়োজনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মূল হলে সর্বশেষ মঞ্চস্থ হয়েছে নাটকটির ৭৯৮তম প্রদর্শনী। আর মাত্র দুটি প্রদর্শনী হলেই ছুঁয়ে ফেলবে ৮০০তম মঞ্চায়নের মহাযজ্ঞ। ১৯৮৭ সালে যাত্রা শুরু করা এই হাস্যরসাত্মক প্রযোজনা চার দশক ধরে নিয়মিত মঞ্চায়িত হয়ে এখন সেই ৮০০তম মাইলফলক হয়তো এ বছরই ছুঁয়ে ফেলবে। এত দীর্ঘ সময় ধরে একটি নাটকের জনপ্রিয়তা ধরে রাখা সহজ কথা নয়। এখানেই ‘কঞ্জুস’ প্রমাণ করে, কেন এটি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও সাড়া জাগানো নাট্যপ্রযোজনা।

ফরাসি নাট্যকার মলিয়েরের ‘দ্য মাইজার’ অবলম্বনে নাটকটির রূপান্তর করেছেন তারিক আনাম খান, নির্দেশনা দিয়েছেন কামরুন নূর চৌধুরী। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র হাড়কিপ্টে হায়দার আলী খানের ভূমিকায় অভিনয় করেন অভিজ্ঞ অভিনেতা আবদুল্লাহ আল হারুন। এ বয়সেও তাঁর মঞ্চ কাঁপানো উপস্থিতি আর সংলাপ বলার ভঙ্গি দেখিয়ে দেয়, দীর্ঘদিনের মঞ্চ-অভিজ্ঞতা একজন শিল্পীকে কতটা পরিণত করে তোলে।

হায়দার আলীর ছেলে কাযিম আলী খান আর মেয়ে লাইলি বেগমকে ঘিরে গড়ে উঠেছে গল্প। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বদিউজ্জামান ওরফে বদি মিয়ার প্রেমকাহিনি। সমুদ্র ভ্রমণে লাইলির প্রেমে পড়ে সে শেষ পর্যন্ত হায়দার আলীর খাস চাকর বনে যায়। অন্যদিকে পাশের বাড়ির মর্জিনা বেগমের সঙ্গে কাযিমের প্রেম যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই বাবা হায়দার আলীর চোখ পড়ে মর্জিনার ওপর। ঘটক গোলাপজানের মধ্যস্থতায় এগোতে থাকে লাইলির সঙ্গে হায়দার আলীর বিয়ের কথা। এই জটিল অথচ সুখপাঠ্য পারিবারিক টানাপোড়েনই নাটকটিকে করেছে গল্প বলার এক অনবদ্য নমুনা। ঘটকের চরিত্রে যিনি অভিনয় করেন, সামসাদ বেগম একাই পাঁচশোর বেশি প্রদর্শনীতে একই ভূমিকায় অভিনয় করে রেকর্ড গড়েছেন।

অভিনয়ে প্রধান চরিত্রের শিল্পীরা যেমন নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন, তেমনি সহযোগী চরিত্রের কুশলীরাও চমক জাগিয়েছেন। প্রতিটি দৃশ্যের নিপুণ উপস্থাপন আর কোরিওগ্রাফির মুনশিয়ানা দর্শককে বারবার হাততালি দিতে বাধ্য করে। সংলাপের ভাষা সাধারণ হলেও রচনাশৈলীর গুণে তা হয়ে ওঠে দারুণ আকর্ষণীয়। বিশেষ করে পুরোনো ঢাকার ‘ঢাকাইয়া’ ভাষা ও সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতিফলন নাটকটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে, যা রূপান্তরের কাজে প্রচলিত কথ্যরীতির চমৎকার ব্যবহারের সাক্ষ্য দেয়। মঞ্চসজ্জা, নৃত্য, আলোকসজ্জা, পোশাক, সংগীত ও রূপসজ্জা, প্রতিটি অনুষঙ্গ মিলেমিশে গড়ে তোলে এক প্রাণবন্ত নাট্য-আবহ। হাসির নাটক হিসেবে এর মূল লক্ষ্যকে তা পুরোপুরি সার্থক করেছে।

বাংলাদেশে নাট্যদর্শক সৃষ্টিতে ‘কঞ্জুস’-এর ভূমিকা ব্যাপক। একবার যিনি নাটকটি দেখেন, পরেরবার তিনি পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধুবান্ধবকে সঙ্গে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। এভাবেই মুখে মুখে ছড়িয়ে নাটকটি গড়ে তুলেছে এক বিশাল দর্শকসমাজ, যাঁদের অনেকের জন্য মঞ্চনাটকের সঙ্গে এটিই প্রথম পরিচয়। শুধু রাজধানীতেই নয়, জেলাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেও প্রদর্শিত হয়েছে নাটকটি। দেশ-বিদেশের দর্শকের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতাই প্রমাণ করে, হাসির ভাষা সীমানা মানে না।

নাটক শেষে দর্শকের মুখে থাকে তৃপ্তির ছাপ। কিছু দৃশ্যে অভিনেতাদের আবেগের প্রকাশ প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশি মনে হলেও নাটকের সামগ্রিক আবেদন তাতে ম্লান হয় না। নির্দেশক ও নাট্যকর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর সব কলাকুশলীর নিষ্ঠা যে বৃথা যায়নি, তার প্রমাণ মেলে প্রতিটি দৃশ্যের নিখুঁত উপস্থাপনায়।

চার দশক পেরিয়েও ৭৯৮তম মঞ্চায়নে যে নাটক দর্শকের মন জয় করতে পেরেছে, তা বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের ইতিহাসে এক বিরল অর্জন। ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তির আয়োজনে ‘কঞ্জুস’ ছিল শুধু একটি নাটক দেখার অভিজ্ঞতা নয়, দেশের সমৃদ্ধ নাট্যচর্চার ঐতিহ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার সুযোগও। মঞ্চনাটকের দর্শক তৈরিতে ‘কঞ্জুস’-এর এই ধারাবাহিক সাফল্য আগামী দিনেও পথ দেখাবে নতুন প্রজন্মের নাট্যকর্মী ও দর্শকদের।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
ডেইলি বাংল সংবাদ

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬


দর্শক তৈরির পাঠশালা, দেশ-বিদেশে হাসির চার দশক।

প্রকাশের তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

দর্শক তৈরির পাঠশালা, দেশ-বিদেশে হাসির চার দশক।

বিশেষ প্রতিনিধি:- মঞ্চ নাটকের দর্শক তৈরিতে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে যে হাতে গোনা কয়েকটি প্রযোজনা অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছে, তার মধ্যে অগ্রগণ্য নাম লোকনাট্য দলের ‘কঞ্জুস’। ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের আয়োজনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মূল হলে সর্বশেষ মঞ্চস্থ হয়েছে নাটকটির ৭৯৮তম প্রদর্শনী। আর মাত্র দুটি প্রদর্শনী হলেই ছুঁয়ে ফেলবে ৮০০তম মঞ্চায়নের মহাযজ্ঞ। ১৯৮৭ সালে যাত্রা শুরু করা এই হাস্যরসাত্মক প্রযোজনা চার দশক ধরে নিয়মিত মঞ্চায়িত হয়ে এখন সেই ৮০০তম মাইলফলক হয়তো এ বছরই ছুঁয়ে ফেলবে। এত দীর্ঘ সময় ধরে একটি নাটকের জনপ্রিয়তা ধরে রাখা সহজ কথা নয়। এখানেই ‘কঞ্জুস’ প্রমাণ করে, কেন এটি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও সাড়া জাগানো নাট্যপ্রযোজনা।

ফরাসি নাট্যকার মলিয়েরের ‘দ্য মাইজার’ অবলম্বনে নাটকটির রূপান্তর করেছেন তারিক আনাম খান, নির্দেশনা দিয়েছেন কামরুন নূর চৌধুরী। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র হাড়কিপ্টে হায়দার আলী খানের ভূমিকায় অভিনয় করেন অভিজ্ঞ অভিনেতা আবদুল্লাহ আল হারুন। এ বয়সেও তাঁর মঞ্চ কাঁপানো উপস্থিতি আর সংলাপ বলার ভঙ্গি দেখিয়ে দেয়, দীর্ঘদিনের মঞ্চ-অভিজ্ঞতা একজন শিল্পীকে কতটা পরিণত করে তোলে।

হায়দার আলীর ছেলে কাযিম আলী খান আর মেয়ে লাইলি বেগমকে ঘিরে গড়ে উঠেছে গল্প। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বদিউজ্জামান ওরফে বদি মিয়ার প্রেমকাহিনি। সমুদ্র ভ্রমণে লাইলির প্রেমে পড়ে সে শেষ পর্যন্ত হায়দার আলীর খাস চাকর বনে যায়। অন্যদিকে পাশের বাড়ির মর্জিনা বেগমের সঙ্গে কাযিমের প্রেম যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই বাবা হায়দার আলীর চোখ পড়ে মর্জিনার ওপর। ঘটক গোলাপজানের মধ্যস্থতায় এগোতে থাকে লাইলির সঙ্গে হায়দার আলীর বিয়ের কথা। এই জটিল অথচ সুখপাঠ্য পারিবারিক টানাপোড়েনই নাটকটিকে করেছে গল্প বলার এক অনবদ্য নমুনা। ঘটকের চরিত্রে যিনি অভিনয় করেন, সামসাদ বেগম একাই পাঁচশোর বেশি প্রদর্শনীতে একই ভূমিকায় অভিনয় করে রেকর্ড গড়েছেন।

অভিনয়ে প্রধান চরিত্রের শিল্পীরা যেমন নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন, তেমনি সহযোগী চরিত্রের কুশলীরাও চমক জাগিয়েছেন। প্রতিটি দৃশ্যের নিপুণ উপস্থাপন আর কোরিওগ্রাফির মুনশিয়ানা দর্শককে বারবার হাততালি দিতে বাধ্য করে। সংলাপের ভাষা সাধারণ হলেও রচনাশৈলীর গুণে তা হয়ে ওঠে দারুণ আকর্ষণীয়। বিশেষ করে পুরোনো ঢাকার ‘ঢাকাইয়া’ ভাষা ও সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতিফলন নাটকটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে, যা রূপান্তরের কাজে প্রচলিত কথ্যরীতির চমৎকার ব্যবহারের সাক্ষ্য দেয়। মঞ্চসজ্জা, নৃত্য, আলোকসজ্জা, পোশাক, সংগীত ও রূপসজ্জা, প্রতিটি অনুষঙ্গ মিলেমিশে গড়ে তোলে এক প্রাণবন্ত নাট্য-আবহ। হাসির নাটক হিসেবে এর মূল লক্ষ্যকে তা পুরোপুরি সার্থক করেছে।

বাংলাদেশে নাট্যদর্শক সৃষ্টিতে ‘কঞ্জুস’-এর ভূমিকা ব্যাপক। একবার যিনি নাটকটি দেখেন, পরেরবার তিনি পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধুবান্ধবকে সঙ্গে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। এভাবেই মুখে মুখে ছড়িয়ে নাটকটি গড়ে তুলেছে এক বিশাল দর্শকসমাজ, যাঁদের অনেকের জন্য মঞ্চনাটকের সঙ্গে এটিই প্রথম পরিচয়। শুধু রাজধানীতেই নয়, জেলাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেও প্রদর্শিত হয়েছে নাটকটি। দেশ-বিদেশের দর্শকের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতাই প্রমাণ করে, হাসির ভাষা সীমানা মানে না।

নাটক শেষে দর্শকের মুখে থাকে তৃপ্তির ছাপ। কিছু দৃশ্যে অভিনেতাদের আবেগের প্রকাশ প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশি মনে হলেও নাটকের সামগ্রিক আবেদন তাতে ম্লান হয় না। নির্দেশক ও নাট্যকর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর সব কলাকুশলীর নিষ্ঠা যে বৃথা যায়নি, তার প্রমাণ মেলে প্রতিটি দৃশ্যের নিখুঁত উপস্থাপনায়।

চার দশক পেরিয়েও ৭৯৮তম মঞ্চায়নে যে নাটক দর্শকের মন জয় করতে পেরেছে, তা বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের ইতিহাসে এক বিরল অর্জন। ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তির আয়োজনে ‘কঞ্জুস’ ছিল শুধু একটি নাটক দেখার অভিজ্ঞতা নয়, দেশের সমৃদ্ধ নাট্যচর্চার ঐতিহ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার সুযোগও। মঞ্চনাটকের দর্শক তৈরিতে ‘কঞ্জুস’-এর এই ধারাবাহিক সাফল্য আগামী দিনেও পথ দেখাবে নতুন প্রজন্মের নাট্যকর্মী ও দর্শকদের।


ডেইলি বাংল সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ মনিরুল ইসলাম । নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ মাহবুব হাসান পাটোয়ারী


কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ডেইলি সংবাদ