ডেইলি বাংল সংবাদ
প্রকাশ : বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

মোল্লাহাটে জমি নিয়ে বিরোধ, অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ দুজনকে মারধরের অভিযোগ

মোল্লাহাটে জমি নিয়ে বিরোধ, অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ দুজনকে মারধরের অভিযোগ

পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় : প্রধানমন্ত্রীর

পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় : প্রধানমন্ত্রীর

চট্টগ্রামে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২৬ পালিত-

চট্টগ্রামে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২৬ পালিত-

কুড়িগ্রামে জেলা পরিবার পরিকল্পনার  উপপরিচালকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ

কুড়িগ্রামে জেলা পরিবার পরিকল্পনার উপপরিচালকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ

পটিয়ার রাজনীতিতে শিষ্টাচার সহনশীলতা শ্রদ্ধাবোধ ও নিজ দলের প্রধানকে অনুসরণ করা জরুরী

পটিয়ার রাজনীতিতে শিষ্টাচার সহনশীলতা শ্রদ্ধাবোধ ও নিজ দলের প্রধানকে অনুসরণ করা জরুরী

গাইবান্ধায় বিএনপি কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ: মাদক সম্রাট পুটুসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে মামলা

গাইবান্ধায় বিএনপি কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ: মাদক সম্রাট পুটুসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে মামলা

পল্টনে ২৮ অক্টোবর ট্রাজেডির দুই দশক পূর্তি: পীরগাছায় জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ

পল্টনে ২৮ অক্টোবর ট্রাজেডির দুই দশক পূর্তি: পীরগাছায় জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ

সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপুর সড়কে ৮৭ কোটি টাকার কাজে অনিয়মের অভিযোগ,পরিদর্শনে এমপি নুরুল ইসলাম

সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপুর সড়কে ৮৭ কোটি টাকার কাজে অনিয়মের অভিযোগ,পরিদর্শনে এমপি নুরুল ইসলাম

আমার আব্বা: একজন স্বপ্নবান কৃষকের গল্প

আমার আব্বা: একজন স্বপ্নবান কৃষকের গল্প

আমার আব্বা: একজন স্বপ্নবান কৃষকের গল্প 

আখলাক হুসাইন:- কিছু মানুষ নিজে বেশি দূর এগোতে পারেন না, অথচ তাঁদের হাত ধরেই এগিয়ে যায় একটি গোটা প্রজন্ম। নিজের জীবনে শিক্ষার আলো পান না, কিন্তু সন্তানের হাতে তুলে দেন জ্ঞানের মশাল। ইতিহাসের পাতায় তাঁদের নাম লেখা থাকে না; তবু তাঁদের ত্যাগের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে বহু মানুষের ভবিষ্যৎ। আমার আব্বা মুহাম্মদ তেরা মিয়া তেমনই একজন- সাধারণ কৃষক, অসাধারণ পিতা, নীরবে স্বপ্ন বুনে যাওয়া এক জীবনসংগ্রামী মানুষ।

মাটির সঙ্গে বন্ধনঃ সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সবুজ-শ্যামল গ্রাম গোসাইনপুর। প্রকৃতির স্নিগ্ধতা, সহজ-সরল গ্রামীণ জীবন আর মাটির গন্ধে মিশে আছে এ জনপদের মানুষের জীবনকথা। এই গ্রামেই ১৯৬১ সালের ১ এপ্রিল জন্ম আমার আব্বার।

তিনি বিত্তশালী পরিবারের সন্তান ছিলেন না। তাঁর জীবনজুড়ে ছিল মাটি, কৃষিকাজ আর প্রতিদিন বেঁচে থাকার লড়াই। স্বাক্ষরজ্ঞানটুকু ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ তাঁর হয়নি। কিন্তু জীবনের পাঠশালায় তিনি শিখেছিলেন পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ, আত্মত্যাগ আর মানুষকে ভালোবাসার মতো বড় গুণ।

কৃষিই ছিল তাঁর জীবিকার প্রধান অবলম্বন। তবে নিজের জমির ফসলে সংসারের সব খরচ মেটানোর মতো বড় কৃষক তিনি ছিলেন না; কৃষির বাইরে স্থায়ী আয়ের কোনো উৎসও ছিল না। তাই প্রয়োজনের তাগিদে মাঝেমধ্যে করতেন ছোটখাটো ব্যবসা। কখনো কৃষিকাজ, কখনো সামান্য ব্যবসা- এভাবেই কেটেছে তাঁর দিন।

একদিকে সংসারের খরচ, অন্যদিকে সন্তানদের ভবিষ্যৎ। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে এ দুইয়ের মেলবন্ধন ঘটানোই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবু নিজের সীমাবদ্ধতাকে তিনি কখনো আমাদের স্বপ্নের সীমা হতে দেননি। তাঁর হাতে সম্পদ ছিল না, কিন্তু ছিল পরিশ্রমের শক্তি; আর সেই শক্তিকে পথ দেখাত একটিই স্বপ্ন-সন্তানদের মানুষ করা।

পাঁচ সন্তানের সংসার, অফুরন্ত দায়িত্বঃ আমরা পাঁচ ভাইবোন- তিন ভাই, দুই বোন। ফসলের ওপর নির্ভরশীল অনিশ্চিত আয়ে পাঁচ সন্তানের ভরণপোষণ, লেখাপড়া আর ভবিষ্যতের ব্যবস্থা করা কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমেয়। একজন কৃষকের আয় তো নিয়মিত বেতনের মতো নিশ্চিত নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রকৃতির খেয়াল, শ্রম আর সময়ের হিসাব।

আমাদের সংসারেও অভাব ছিল, ছিল নানা দুশ্চিন্তা। কিন্তু সেই অভাবের মধ্যেও আব্বার দায়িত্ববোধে কখনো ঘাটতি দেখিনি। সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন, আমাদের প্রয়োজন মিটিয়েছেন, এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে দিয়েছেন। তাঁর সংগ্রামের গভীরতা বুঝতে হলে শুধু আয়ের পরিমাণ দেখলে চলবে না; দেখতে হবে, সেই সামান্য আয়ের ওপর তিনি কত বড় দায়িত্বের বোঝা বহন করেছেন।

প্রচলিত অর্থে বড় কোনো সম্পদ তিনি আমাদের জন্য সংগ্রহ করতে পারেননি। কিন্তু আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন শিক্ষার সুযোগ, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রেরণা আর প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করার সাহস। আমার কাছে এটাই তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরাধিকার।

মায়ের অসুস্থতা: এক দীর্ঘ বেদনাময় অধ্যায়ঃ আমার বয়স যখন প্রায় বারো, তখন থেকেই আম্মাকে অসুস্থ দেখে আসছি। যে বয়সে একটি শিশুর মায়ের স্নেহ আর পরিচর্যায় বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়স থেকেই আমাদের পরিবারকে মায়ের অসুস্থতার বাস্তবতার সঙ্গে বসবাস করতে হয়েছে। আজ আমার বয়স প্রায় আটত্রিশ; অর্থাৎ জীবনের দীর্ঘ একটি সময়জুড়ে এই অসুস্থতা ছিল আমাদের পারিবারিক জীবনের অংশ। আলহামদুলিল্লাহ, গত তিন-চার বছর ধরে আম্মাকে তুলনামূলক সুস্থ দেখছি- এ আমাদের জন্য পরম স্বস্তির।

তবুও সেই দীর্ঘ অসুস্থতা সংসারে যে ছাপ ফেলেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমার দুই বোন পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি। মায়ের অসুস্থতা ও পারিবারিক নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের শিক্ষাজীবন সেখানেই থেমে যায়। আজ পেছনে ফিরে তাকালে বুঝি, একটি পরিবারের সংকট কেবল একজন মানুষকে স্পর্শ করে না; তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি সদস্যের জীবনে। পড়াশোনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হলে হয়তো তাদের সামনেও খুলে যেত ভিন্ন সম্ভাবনার দুয়ার।

এসব স্মৃতি মনে পড়লে মন ভারাক্রান্ত হয়। কিন্তু একই সঙ্গে আব্বার প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায়। সংসারের সীমাবদ্ধতা, মায়ের অসুস্থতা আর জীবিকার অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়েও তিনি আমাদের তিন ভাইয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন; সন্তানদের ভবিষ্যতের প্রশ্নে হাল ছাড়েননি।

নিজের অপূর্ণতা, সন্তানের পূর্ণতার স্বপ্নঃ আব্বার জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো- নিজে উচ্চশিক্ষিত না হয়েও তিনি শিক্ষার মূল্য গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। শিক্ষাব্যবস্থার জটিল তত্ত্ব হয়তো তিনি জানতেন না; কিন্তু বুঝতেন, শিক্ষা মানুষকে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখায়, জীবন বদলের সুযোগ দেয়, সমাজের জন্য উপকারী করে তোলে। নিজের জীবনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ সীমিত ছিল, কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা তিনি সন্তানদের ওপর চাপিয়ে দেননি। বরং চেয়েছেন, আমরা উচ্চশিক্ষিত হই।

এখানেই আমার আব্বার মহত্ত্ব। অনেক মানুষ নিজের অপূর্ণতাকে নিয়তি বলে মেনে নেন। কিন্তু কিছু মানুষ নিজের অপূর্ণ স্বপ্নকে সন্তানের জীবনে পূর্ণ হতে দেখতে চান। নিজে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারলেও তাঁরা সন্তানের হাতে তুলে দেন সেই গন্তব্যের মানচিত্র। আমার আব্বা তেমনই একজন। তাঁর ছিল না প্রচুর অর্থ, সামাজিক প্রভাব কিংবা বড় কোনো পরিচয়। ছিল পরিশ্রম করার ক্ষমতা, সন্তানের প্রতি গভীর ভালোবাসা আর তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে একান্ত আকাঙ্ক্ষা।

আমি আব্বার বড় ছেলে। বড় সন্তান হওয়ার কারণে দায়িত্বের অনুভূতি একটু আগেই মনে জায়গা করে নেয়। ছোটবেলা থেকেই কাছ থেকে দেখেছি সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে আব্বার প্রাণপণ চেষ্টা, মায়ের অসুস্থতাকে ঘিরে পরিবারের দুশ্চিন্তা, আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সংসারকে টেনে নেওয়ার সংগ্রাম। এই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, কোনো মানুষের সাফল্য শুধু তার নিজের মেধা ও পরিশ্রমের ফল নয়; এর পেছনে থাকে বহু মানুষের অবদান- কখনো দৃশ্যমান, কখনো নেপথ্যে।

আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি বাংলাদেশের তিন ধারার শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটিতেই পড়াশোনার সৌভাগ্য পেয়েছি। নিজে অক্ষরজ্ঞানের বাইরে যেতে না পারলেও আব্বারই প্রচেষ্টায় আমি এতগুলো ধারায় শিক্ষা অর্জনের সুযোগ পেয়েছি। তাঁর সেই স্বপ্ন আমার মাধ্যমে অনেকাংশে পূর্ণতা পেয়েছে। তাই এ অর্জনকে আমি কখনো শুধু নিজের বলে ভাবি না। এর সঙ্গে মিশে আছে একজন কৃষকের ঘাম, একজন পিতার আত্মত্যাগ আর একটি পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রাম। আমার সনদে হয়তো আমার নাম লেখা, কিন্তু অর্জনের নেপথ্যে নীরবে শ্রম দিয়ে যাওয়া মানুষটির নামও সেখানে অদৃশ্য অক্ষরে লেখা আছে- মুহাম্মদ তেরা মিয়া।

আমাদের তিন ভাইয়ের পথ অবশ্য এক নয়। মেজ ভাই নূমান হুসাইনকে আব্বা মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়িয়েছেন; এখন সে একটি কোম্পানিতে চাকরি করছে। ছোট ভাই মাছুম হুসাইন অনার্সে পড়ছে এবং পাশাপাশি গ্রাফিকস ডিজাইনার হিসেবে কাজ করছে। একজন পিতা সন্তানদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারেন, পরিশ্রম করতে পারেন; কিন্তু প্রত্যেক সন্তানের পথচলা আর অর্জনের ধরন আলাদা হতে পারে। তবু একটি বিষয়ে আমরা অভিন্ন- আমরা এমন এক পিতার সন্তান, যিনি নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমাদের জন্য সর্বোচ্চটুকু করেছেন। সেই ঋণ কেবল অর্থের নয়; ভালোবাসার, ত্যাগের, আর জীবনের মূল্যবান সময় উৎসর্গ করার ঋণ।

গল্পের পিতা, শৈশবের আনন্দঃ আব্বার আরেকটি সুন্দর দিকের কথা না বললেই নয়- তিনি ছিলেন খুব গল্পপ্রিয় মানুষ। ছোটবেলায় আমাদের কত যে কিচ্ছাকাহিনি শোনাতেন! তাঁর মুখে গল্প শোনা ছিল শৈশবের সবচেয়ে আনন্দময় মুহূর্তগুলোর একটি; সেই আনন্দ আজও স্মৃতিতে অনুভব করি।

আমার জন্মের কয়েক দিন আগে দাদা ইন্তেকাল করেন। দাদি চলে গিয়েছিলেন তারও অনেক আগে। তাই আমরা কোনো ভাইবোনই দাদা-দাদির আদর পাইনি। তাঁদের কাছে আবদার করার অনুভূতি, কোলে মাথা রেখে গল্প শোনার আনন্দ- এসব আমাদের জীবনে অনুপস্থিত ছিল। অথচ আমার মনে হতো, আব্বা যেন নিজের ভালোবাসা দিয়ে সেই শূন্যতার অনেকখানিই ভরিয়ে দিতেন। গল্প শোনাতেন, সময় দিতেন, স্নেহ করতেন।

আজ জীবনের ব্যস্ততায় শৈশবের অনেক স্মৃতি ঝাপসা হয়ে গেছে। কিন্তু আব্বার গল্প বলার সেই দৃশ্যগুলো মনে পড়লে বুঝতে পারি, পিতার ভালোবাসা কেবল খাবার, পোশাক কিংবা শিক্ষার ব্যবস্থা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সন্তানকে সময় দেওয়া, তার সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এবং তার শৈশবকে স্মরণীয় করে তোলাও পিতৃত্বের অংশ। আব্বা তা পুরোপুরিই দিয়েছেন।

একটি জমি, একটি স্বপ্ন, একটি বিদ্যালয়ঃ আব্বার জীবনের একটি ঘটনা আমার কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এতে ফুটে ওঠে কেবল তাঁর পিতৃস্নেহ নয়, শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ আর সমাজের জন্য কিছু করার মানসিকতাও।

পড়াশোনা শেষ করে বাড়ি ফেরার পর এলাকার জন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ভাবনা আমার মনে জাগে। আব্বাকে বিষয়টি জানালাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কী করতে হবে?” আমি বললাম, “প্রথমে জমি দরকার।”

কৃষিনির্ভর একজন মানুষের কাছে জমি শুধু সম্পত্তি নয়; সেটি জীবিকার অবলম্বন, পরিশ্রমের সঞ্চয় আর ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। অনেক কষ্টে কেনা যে একটুকরো জমি তাঁর ছিল, তা নিশ্চয়ই তাঁর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। অথচ সেই জমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য দেওয়ার কথা উঠতেই তিনি এতটুকু দ্বিধা করলেন না। একবার ভাবুন- যে কৃষকের প্রতিটি প্রয়োজন মেটাতে লড়াই করতে হয়, যাঁর সংসারে বড় কোনো সঞ্চয় নেই, তিনি নিজের কষ্টার্জিত জমি অন্যের ভবিষ্যৎ গড়তে দিতে রাজি! এর জন্য শুধু আর্থিক ত্যাগ নয়, দরকার শিক্ষার প্রতি গভীর ভালোবাসা আর নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজকে ভাবার মন।

আব্বার সেই সম্মতি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। পরে আরও কয়েকজন দাতা যুক্ত হলেন, পাশে দাঁড়ালেন গ্রামবাসীও। সবার সম্মিলিত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হলো গোসাইনপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।

আমার কাছে এটি শুধু একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘটনা নয়; এ ছিল আব্বার দীর্ঘদিনের বিশ্বাসের বাস্তব রূপ। যে মানুষটি নিজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিলেন, তিনিই নিজের কষ্টার্জিত সম্পদের অংশ দিয়ে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পথ সুগম করলেন। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, এটি একটি বালিকা বিদ্যালয়। আমার দুই বোনের পড়াশোনা পঞ্চম শ্রেণির পর থেমে যাওয়ার স্মৃতি আজও জীবন্ত। সেই বাস্তবতায় এলাকার মেয়েদের জন্য একটি বিদ্যালয় গড়ে ওঠা আমাকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে। যেন আমাদের পরিবারের অভিজ্ঞতাই বৃহত্তর সমাজে মেয়েদের শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধির উপলক্ষ হয়ে উঠেছিল।

আব্বা বড় বক্তৃতা দিয়ে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বোঝাননি, শিক্ষার অধিকার নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনাও করেননি। কিন্তু নিজের কষ্টে কেনা জমি দিতে সম্মত হয়ে তিনি যে দৃষ্টান্ত রেখেছেন, তা অনেক কথার চেয়েও শক্তিশালী। যেন নিজের জীবন দিয়েই বলে গেছেন- শিক্ষা শুধু নিজের সন্তানের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য। মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব তার সম্পদের পরিমাণে নয়, সেই সম্পদ দিয়ে সে কী করতে চায়, তাতেই প্রকাশ পায়।

বয়স বেড়েছে, থামেনি সংগ্রামঃ সমাজে আমরা প্রায়ই বড় পদের মানুষ, বিত্তশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবদানের কথা বলি; তাঁদের নামে প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, জীবনী লেখা হয়। কিন্তু একজন সাধারণ কৃষকের অবদান অনেক সময় থেকে যায় চোখের আড়ালে। অথচ এই কৃষকরাই মাঠে ফসল ফলান, মানুষের মুখে খাবার জোগান, পরিবারকে টিকিয়ে রাখেন, আর নিজেদের সীমিত সামর্থ্যেই সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে চান।

আব্বার বয়স এখন পঁয়ষট্টি। এই বয়সে অনেকে অবসরের কথা ভাবেন, কিন্তু তিনি এখনো কৃষিকাজে যুক্ত। যে হাত একদিন আমাদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে ঘেমেছে, সেই হাত আজও মাটির সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখেছে। এই দৃশ্যের মধ্যে আমি এক গভীর সৌন্দর্য দেখি। তাঁর বড় প্রাপ্তি ব্যাংক-ব্যালান্স নয়, বিশাল বাড়ি নয়, জমিজমার পাহাড়ও নয়। তিনি হয়তো নিজের সংগ্রামের কথা বেশি বলেন না, অতীত বিশ্লেষণ করতেও বসেন না। কিন্তু তাঁর জীবনই তাঁর হয়ে কথা বলে। মানুষের প্রকৃত পরিচয় অনেক সময় বক্তব্যে নয়, দীর্ঘদিনের কাজেই প্রকাশ পায়।

আমার কাছে আব্বার সবচেয়ে বড় পরিচয়ঃ আমার আব্বা একজন কৃষক, কিন্তু আমার কাছে তিনি শুধু কৃষক নন। তিনি এমন পিতা, যিনি নিজের সীমাবদ্ধতাকে সন্তানের স্বপ্নের সীমা হতে দেননি। এমন মানুষ, যিনি নিজে উচ্চশিক্ষিত না হয়েও শিক্ষার মূল্য বুঝেছেন। এমন অভিভাবক, যিনি নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে চেয়েছেন। এমন সমাজসচেতন মানুষ, যিনি কষ্টার্জিত জমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজে দিতে সম্মত হয়েছেন।

নিজের অর্জনের দিকে তাকালে তাঁর অবদান দেখতে পাই; ভাইদের ভবিষ্যতের কথা ভাবলে মনে পড়ে তাঁর পরিশ্রম; গোসাইনপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কথা এলে চোখে ভাসে তাঁর সেই সিদ্ধান্ত। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়- একই জীবনদর্শনের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ। তাঁর সংগ্রাম শুধু নিজের সংসার টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম ছিল না; সেই সংগ্রামের ভেতর থেকেই তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু করার মানসিকতা ধারণ করেছেন।

মুহাম্মদ তেরা মিয়ার জীবনকে এক বাক্যে বলতে হলে আমি বলব- তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অন্যের ভবিষ্যতের পথ তৈরি করেছেন। তাঁর গল্পে আছে গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতা, কৃষিশ্রমের কঠোরতা, স্ত্রীর দীর্ঘ অসুস্থতার বেদনা, সন্তানের শিক্ষার জন্য লড়াই, পিতৃস্নেহের কোমলতা আর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার কাজে সহযোগিতার গৌরব। এ কোনো রাজপ্রাসাদের গল্প নয়; এখানে নেই সম্পদের অহংকার বা ক্ষমতার দাপট। আছে একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ দায়িত্ববোধ। তিনি ইতিহাসের বিখ্যাত কেউ নন, তাঁকে নিয়ে সভা-সেমিনারও হয়নি; কিন্তু একটি পরিবারের ইতিহাসে তাঁর স্থান অনন্য, আর গোসাইনপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর ভূমিকা তাঁর জীবনসংগ্রামের এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।

আমি বিশ্বাস করি, সমাজে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন- কেউ শ্রম দিয়ে সন্তানকে শিক্ষিত করেন, কেউ সামান্য সঞ্চয় ব্যয় করেন, কেউ জমি দান করেন, কেউ পাশে দাঁড়িয়ে একটি উদ্যোগকে সফল করেন। তাঁদের জীবনকথা সামনে এলে আমরা নতুন করে বুঝব, একটি আলোকিত প্রজন্ম গড়ে ওঠার পেছনে কত মানুষের নীরব ত্যাগ কাজ করে।

আব্বা, আপনি আমার জীবন্ত পাঠশালাঃজীবনের পথে আমরা বহু শিক্ষকের কাছে শিখি; বই পড়ি, নানা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করি। কিন্তু কিছু শিক্ষা মেলে না বইয়ের পাতায়- মেলে মানুষের জীবনে, তাঁদের ত্যাগে, তাঁদের সংগ্রামে। আমার আব্বা আমার জীবনের তেমনই এক শিক্ষক।

তিনি শিখিয়েছেন, অভাব থাকা অপরাধ নয়; অভাবের কাছে স্বপ্নকে হারতে দেওয়াই পরাজয়। শিখিয়েছেন, নিজে শিক্ষিত না হয়েও শিক্ষার পক্ষে দাঁড়ানো যায়; সম্পদ সীমিত হলেও মহৎ কাজে শরিক হওয়া যায়; প্রতিকূলতার মধ্যেও দায়িত্ব পালন করে যাওয়া যায়। শিখিয়েছেন, মানুষের পরিচয় তার সামাজিক অবস্থানে নয়, তার চিন্তা, কর্ম ও অবদানে।

আজ আমি যদি মানুষের জন্য কিছু করতে চাই, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার স্বপ্ন দেখি, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ অনুভব করি- তবে এর পেছনেও আছে আব্বার জীবন থেকে পাওয়া শিক্ষা। তিনি কোনোদিন আনুষ্ঠানিকভাবে আমাকে এসব শেখাননি; তাঁর জীবনই শিখিয়েছে, নিজের অর্জনকে অন্যের কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলেই তা অর্থবহ হয়ে ওঠে। ভবিষ্যতে আমার জীবনে কতটুকু অর্জন যোগ হবে, মানুষের জন্য কতটুকু করতে পারব জানি না। শুধু জানি, আমার প্রতিটি ভালো কাজের পেছনে আব্বার শিক্ষার একটি অংশ থেকে যাবে।

মানুষ কতটা সম্পদশালী, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন সে কতটা মানুষ গড়তে পেরেছে, কতটা স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে, আর নিজের সামর্থ্য দিয়ে কল্যাণের কতটা পথ তৈরি করতে পেরেছে। এই বিচারে আমার আব্বা আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানুষ।

আল্লাহ তাআলা আমার আব্বা-আম্মাকে সুস্থতা, নেক হায়াত ও প্রশান্তিময় জীবন দান করুন। তাঁদের জীবনের কষ্টগুলোকে নেকিতে পরিণত করুন, ত্যাগের উত্তম প্রতিদান দিন এবং তাঁদের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালনের তাওফিক আমাকে ও আমার ভাইদের দান করুন। আমিন।

আব্বা, আপনার জীবনসংগ্রামের সবটুকু কোনো লেখায় ধরা সম্ভব নয়। তবু এই লেখার প্রতিটি শব্দে রইল আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার সামান্য প্রকাশ। আপনি শুধু আমার পিতা নন- আপনি আমার অস্তিত্বের শিকড়, আমার শিক্ষার নেপথ্যের কারিগর, আমার জীবনের এক জীবন্ত পাঠশালা

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
ডেইলি বাংল সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬


আমার আব্বা: একজন স্বপ্নবান কৃষকের গল্প

প্রকাশের তারিখ : ২৮ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

আমার আব্বা: একজন স্বপ্নবান কৃষকের গল্প 

আখলাক হুসাইন:- কিছু মানুষ নিজে বেশি দূর এগোতে পারেন না, অথচ তাঁদের হাত ধরেই এগিয়ে যায় একটি গোটা প্রজন্ম। নিজের জীবনে শিক্ষার আলো পান না, কিন্তু সন্তানের হাতে তুলে দেন জ্ঞানের মশাল। ইতিহাসের পাতায় তাঁদের নাম লেখা থাকে না; তবু তাঁদের ত্যাগের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে বহু মানুষের ভবিষ্যৎ। আমার আব্বা মুহাম্মদ তেরা মিয়া তেমনই একজন- সাধারণ কৃষক, অসাধারণ পিতা, নীরবে স্বপ্ন বুনে যাওয়া এক জীবনসংগ্রামী মানুষ।

মাটির সঙ্গে বন্ধনঃ সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সবুজ-শ্যামল গ্রাম গোসাইনপুর। প্রকৃতির স্নিগ্ধতা, সহজ-সরল গ্রামীণ জীবন আর মাটির গন্ধে মিশে আছে এ জনপদের মানুষের জীবনকথা। এই গ্রামেই ১৯৬১ সালের ১ এপ্রিল জন্ম আমার আব্বার।

তিনি বিত্তশালী পরিবারের সন্তান ছিলেন না। তাঁর জীবনজুড়ে ছিল মাটি, কৃষিকাজ আর প্রতিদিন বেঁচে থাকার লড়াই। স্বাক্ষরজ্ঞানটুকু ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ তাঁর হয়নি। কিন্তু জীবনের পাঠশালায় তিনি শিখেছিলেন পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ, আত্মত্যাগ আর মানুষকে ভালোবাসার মতো বড় গুণ।

কৃষিই ছিল তাঁর জীবিকার প্রধান অবলম্বন। তবে নিজের জমির ফসলে সংসারের সব খরচ মেটানোর মতো বড় কৃষক তিনি ছিলেন না; কৃষির বাইরে স্থায়ী আয়ের কোনো উৎসও ছিল না। তাই প্রয়োজনের তাগিদে মাঝেমধ্যে করতেন ছোটখাটো ব্যবসা। কখনো কৃষিকাজ, কখনো সামান্য ব্যবসা- এভাবেই কেটেছে তাঁর দিন।

একদিকে সংসারের খরচ, অন্যদিকে সন্তানদের ভবিষ্যৎ। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে এ দুইয়ের মেলবন্ধন ঘটানোই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবু নিজের সীমাবদ্ধতাকে তিনি কখনো আমাদের স্বপ্নের সীমা হতে দেননি। তাঁর হাতে সম্পদ ছিল না, কিন্তু ছিল পরিশ্রমের শক্তি; আর সেই শক্তিকে পথ দেখাত একটিই স্বপ্ন-সন্তানদের মানুষ করা।

পাঁচ সন্তানের সংসার, অফুরন্ত দায়িত্বঃ আমরা পাঁচ ভাইবোন- তিন ভাই, দুই বোন। ফসলের ওপর নির্ভরশীল অনিশ্চিত আয়ে পাঁচ সন্তানের ভরণপোষণ, লেখাপড়া আর ভবিষ্যতের ব্যবস্থা করা কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমেয়। একজন কৃষকের আয় তো নিয়মিত বেতনের মতো নিশ্চিত নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রকৃতির খেয়াল, শ্রম আর সময়ের হিসাব।

আমাদের সংসারেও অভাব ছিল, ছিল নানা দুশ্চিন্তা। কিন্তু সেই অভাবের মধ্যেও আব্বার দায়িত্ববোধে কখনো ঘাটতি দেখিনি। সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন, আমাদের প্রয়োজন মিটিয়েছেন, এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে দিয়েছেন। তাঁর সংগ্রামের গভীরতা বুঝতে হলে শুধু আয়ের পরিমাণ দেখলে চলবে না; দেখতে হবে, সেই সামান্য আয়ের ওপর তিনি কত বড় দায়িত্বের বোঝা বহন করেছেন।

প্রচলিত অর্থে বড় কোনো সম্পদ তিনি আমাদের জন্য সংগ্রহ করতে পারেননি। কিন্তু আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন শিক্ষার সুযোগ, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রেরণা আর প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করার সাহস। আমার কাছে এটাই তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরাধিকার।

মায়ের অসুস্থতা: এক দীর্ঘ বেদনাময় অধ্যায়ঃ আমার বয়স যখন প্রায় বারো, তখন থেকেই আম্মাকে অসুস্থ দেখে আসছি। যে বয়সে একটি শিশুর মায়ের স্নেহ আর পরিচর্যায় বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়স থেকেই আমাদের পরিবারকে মায়ের অসুস্থতার বাস্তবতার সঙ্গে বসবাস করতে হয়েছে। আজ আমার বয়স প্রায় আটত্রিশ; অর্থাৎ জীবনের দীর্ঘ একটি সময়জুড়ে এই অসুস্থতা ছিল আমাদের পারিবারিক জীবনের অংশ। আলহামদুলিল্লাহ, গত তিন-চার বছর ধরে আম্মাকে তুলনামূলক সুস্থ দেখছি- এ আমাদের জন্য পরম স্বস্তির।

তবুও সেই দীর্ঘ অসুস্থতা সংসারে যে ছাপ ফেলেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমার দুই বোন পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি। মায়ের অসুস্থতা ও পারিবারিক নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের শিক্ষাজীবন সেখানেই থেমে যায়। আজ পেছনে ফিরে তাকালে বুঝি, একটি পরিবারের সংকট কেবল একজন মানুষকে স্পর্শ করে না; তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি সদস্যের জীবনে। পড়াশোনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হলে হয়তো তাদের সামনেও খুলে যেত ভিন্ন সম্ভাবনার দুয়ার।

এসব স্মৃতি মনে পড়লে মন ভারাক্রান্ত হয়। কিন্তু একই সঙ্গে আব্বার প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায়। সংসারের সীমাবদ্ধতা, মায়ের অসুস্থতা আর জীবিকার অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়েও তিনি আমাদের তিন ভাইয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন; সন্তানদের ভবিষ্যতের প্রশ্নে হাল ছাড়েননি।

নিজের অপূর্ণতা, সন্তানের পূর্ণতার স্বপ্নঃ আব্বার জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো- নিজে উচ্চশিক্ষিত না হয়েও তিনি শিক্ষার মূল্য গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। শিক্ষাব্যবস্থার জটিল তত্ত্ব হয়তো তিনি জানতেন না; কিন্তু বুঝতেন, শিক্ষা মানুষকে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখায়, জীবন বদলের সুযোগ দেয়, সমাজের জন্য উপকারী করে তোলে। নিজের জীবনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ সীমিত ছিল, কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা তিনি সন্তানদের ওপর চাপিয়ে দেননি। বরং চেয়েছেন, আমরা উচ্চশিক্ষিত হই।

এখানেই আমার আব্বার মহত্ত্ব। অনেক মানুষ নিজের অপূর্ণতাকে নিয়তি বলে মেনে নেন। কিন্তু কিছু মানুষ নিজের অপূর্ণ স্বপ্নকে সন্তানের জীবনে পূর্ণ হতে দেখতে চান। নিজে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারলেও তাঁরা সন্তানের হাতে তুলে দেন সেই গন্তব্যের মানচিত্র। আমার আব্বা তেমনই একজন। তাঁর ছিল না প্রচুর অর্থ, সামাজিক প্রভাব কিংবা বড় কোনো পরিচয়। ছিল পরিশ্রম করার ক্ষমতা, সন্তানের প্রতি গভীর ভালোবাসা আর তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে একান্ত আকাঙ্ক্ষা।

আমি আব্বার বড় ছেলে। বড় সন্তান হওয়ার কারণে দায়িত্বের অনুভূতি একটু আগেই মনে জায়গা করে নেয়। ছোটবেলা থেকেই কাছ থেকে দেখেছি সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে আব্বার প্রাণপণ চেষ্টা, মায়ের অসুস্থতাকে ঘিরে পরিবারের দুশ্চিন্তা, আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সংসারকে টেনে নেওয়ার সংগ্রাম। এই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, কোনো মানুষের সাফল্য শুধু তার নিজের মেধা ও পরিশ্রমের ফল নয়; এর পেছনে থাকে বহু মানুষের অবদান- কখনো দৃশ্যমান, কখনো নেপথ্যে।

আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি বাংলাদেশের তিন ধারার শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটিতেই পড়াশোনার সৌভাগ্য পেয়েছি। নিজে অক্ষরজ্ঞানের বাইরে যেতে না পারলেও আব্বারই প্রচেষ্টায় আমি এতগুলো ধারায় শিক্ষা অর্জনের সুযোগ পেয়েছি। তাঁর সেই স্বপ্ন আমার মাধ্যমে অনেকাংশে পূর্ণতা পেয়েছে। তাই এ অর্জনকে আমি কখনো শুধু নিজের বলে ভাবি না। এর সঙ্গে মিশে আছে একজন কৃষকের ঘাম, একজন পিতার আত্মত্যাগ আর একটি পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রাম। আমার সনদে হয়তো আমার নাম লেখা, কিন্তু অর্জনের নেপথ্যে নীরবে শ্রম দিয়ে যাওয়া মানুষটির নামও সেখানে অদৃশ্য অক্ষরে লেখা আছে- মুহাম্মদ তেরা মিয়া।

আমাদের তিন ভাইয়ের পথ অবশ্য এক নয়। মেজ ভাই নূমান হুসাইনকে আব্বা মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়িয়েছেন; এখন সে একটি কোম্পানিতে চাকরি করছে। ছোট ভাই মাছুম হুসাইন অনার্সে পড়ছে এবং পাশাপাশি গ্রাফিকস ডিজাইনার হিসেবে কাজ করছে। একজন পিতা সন্তানদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারেন, পরিশ্রম করতে পারেন; কিন্তু প্রত্যেক সন্তানের পথচলা আর অর্জনের ধরন আলাদা হতে পারে। তবু একটি বিষয়ে আমরা অভিন্ন- আমরা এমন এক পিতার সন্তান, যিনি নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমাদের জন্য সর্বোচ্চটুকু করেছেন। সেই ঋণ কেবল অর্থের নয়; ভালোবাসার, ত্যাগের, আর জীবনের মূল্যবান সময় উৎসর্গ করার ঋণ।

গল্পের পিতা, শৈশবের আনন্দঃ আব্বার আরেকটি সুন্দর দিকের কথা না বললেই নয়- তিনি ছিলেন খুব গল্পপ্রিয় মানুষ। ছোটবেলায় আমাদের কত যে কিচ্ছাকাহিনি শোনাতেন! তাঁর মুখে গল্প শোনা ছিল শৈশবের সবচেয়ে আনন্দময় মুহূর্তগুলোর একটি; সেই আনন্দ আজও স্মৃতিতে অনুভব করি।

আমার জন্মের কয়েক দিন আগে দাদা ইন্তেকাল করেন। দাদি চলে গিয়েছিলেন তারও অনেক আগে। তাই আমরা কোনো ভাইবোনই দাদা-দাদির আদর পাইনি। তাঁদের কাছে আবদার করার অনুভূতি, কোলে মাথা রেখে গল্প শোনার আনন্দ- এসব আমাদের জীবনে অনুপস্থিত ছিল। অথচ আমার মনে হতো, আব্বা যেন নিজের ভালোবাসা দিয়ে সেই শূন্যতার অনেকখানিই ভরিয়ে দিতেন। গল্প শোনাতেন, সময় দিতেন, স্নেহ করতেন।

আজ জীবনের ব্যস্ততায় শৈশবের অনেক স্মৃতি ঝাপসা হয়ে গেছে। কিন্তু আব্বার গল্প বলার সেই দৃশ্যগুলো মনে পড়লে বুঝতে পারি, পিতার ভালোবাসা কেবল খাবার, পোশাক কিংবা শিক্ষার ব্যবস্থা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সন্তানকে সময় দেওয়া, তার সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এবং তার শৈশবকে স্মরণীয় করে তোলাও পিতৃত্বের অংশ। আব্বা তা পুরোপুরিই দিয়েছেন।

একটি জমি, একটি স্বপ্ন, একটি বিদ্যালয়ঃ আব্বার জীবনের একটি ঘটনা আমার কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এতে ফুটে ওঠে কেবল তাঁর পিতৃস্নেহ নয়, শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ আর সমাজের জন্য কিছু করার মানসিকতাও।

পড়াশোনা শেষ করে বাড়ি ফেরার পর এলাকার জন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ভাবনা আমার মনে জাগে। আব্বাকে বিষয়টি জানালাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কী করতে হবে?” আমি বললাম, “প্রথমে জমি দরকার।”

কৃষিনির্ভর একজন মানুষের কাছে জমি শুধু সম্পত্তি নয়; সেটি জীবিকার অবলম্বন, পরিশ্রমের সঞ্চয় আর ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। অনেক কষ্টে কেনা যে একটুকরো জমি তাঁর ছিল, তা নিশ্চয়ই তাঁর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। অথচ সেই জমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য দেওয়ার কথা উঠতেই তিনি এতটুকু দ্বিধা করলেন না। একবার ভাবুন- যে কৃষকের প্রতিটি প্রয়োজন মেটাতে লড়াই করতে হয়, যাঁর সংসারে বড় কোনো সঞ্চয় নেই, তিনি নিজের কষ্টার্জিত জমি অন্যের ভবিষ্যৎ গড়তে দিতে রাজি! এর জন্য শুধু আর্থিক ত্যাগ নয়, দরকার শিক্ষার প্রতি গভীর ভালোবাসা আর নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজকে ভাবার মন।

আব্বার সেই সম্মতি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। পরে আরও কয়েকজন দাতা যুক্ত হলেন, পাশে দাঁড়ালেন গ্রামবাসীও। সবার সম্মিলিত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হলো গোসাইনপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।

আমার কাছে এটি শুধু একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘটনা নয়; এ ছিল আব্বার দীর্ঘদিনের বিশ্বাসের বাস্তব রূপ। যে মানুষটি নিজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিলেন, তিনিই নিজের কষ্টার্জিত সম্পদের অংশ দিয়ে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পথ সুগম করলেন। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, এটি একটি বালিকা বিদ্যালয়। আমার দুই বোনের পড়াশোনা পঞ্চম শ্রেণির পর থেমে যাওয়ার স্মৃতি আজও জীবন্ত। সেই বাস্তবতায় এলাকার মেয়েদের জন্য একটি বিদ্যালয় গড়ে ওঠা আমাকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে। যেন আমাদের পরিবারের অভিজ্ঞতাই বৃহত্তর সমাজে মেয়েদের শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধির উপলক্ষ হয়ে উঠেছিল।

আব্বা বড় বক্তৃতা দিয়ে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বোঝাননি, শিক্ষার অধিকার নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনাও করেননি। কিন্তু নিজের কষ্টে কেনা জমি দিতে সম্মত হয়ে তিনি যে দৃষ্টান্ত রেখেছেন, তা অনেক কথার চেয়েও শক্তিশালী। যেন নিজের জীবন দিয়েই বলে গেছেন- শিক্ষা শুধু নিজের সন্তানের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য। মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব তার সম্পদের পরিমাণে নয়, সেই সম্পদ দিয়ে সে কী করতে চায়, তাতেই প্রকাশ পায়।

বয়স বেড়েছে, থামেনি সংগ্রামঃ সমাজে আমরা প্রায়ই বড় পদের মানুষ, বিত্তশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবদানের কথা বলি; তাঁদের নামে প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, জীবনী লেখা হয়। কিন্তু একজন সাধারণ কৃষকের অবদান অনেক সময় থেকে যায় চোখের আড়ালে। অথচ এই কৃষকরাই মাঠে ফসল ফলান, মানুষের মুখে খাবার জোগান, পরিবারকে টিকিয়ে রাখেন, আর নিজেদের সীমিত সামর্থ্যেই সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে চান।

আব্বার বয়স এখন পঁয়ষট্টি। এই বয়সে অনেকে অবসরের কথা ভাবেন, কিন্তু তিনি এখনো কৃষিকাজে যুক্ত। যে হাত একদিন আমাদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে ঘেমেছে, সেই হাত আজও মাটির সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখেছে। এই দৃশ্যের মধ্যে আমি এক গভীর সৌন্দর্য দেখি। তাঁর বড় প্রাপ্তি ব্যাংক-ব্যালান্স নয়, বিশাল বাড়ি নয়, জমিজমার পাহাড়ও নয়। তিনি হয়তো নিজের সংগ্রামের কথা বেশি বলেন না, অতীত বিশ্লেষণ করতেও বসেন না। কিন্তু তাঁর জীবনই তাঁর হয়ে কথা বলে। মানুষের প্রকৃত পরিচয় অনেক সময় বক্তব্যে নয়, দীর্ঘদিনের কাজেই প্রকাশ পায়।

আমার কাছে আব্বার সবচেয়ে বড় পরিচয়ঃ আমার আব্বা একজন কৃষক, কিন্তু আমার কাছে তিনি শুধু কৃষক নন। তিনি এমন পিতা, যিনি নিজের সীমাবদ্ধতাকে সন্তানের স্বপ্নের সীমা হতে দেননি। এমন মানুষ, যিনি নিজে উচ্চশিক্ষিত না হয়েও শিক্ষার মূল্য বুঝেছেন। এমন অভিভাবক, যিনি নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে চেয়েছেন। এমন সমাজসচেতন মানুষ, যিনি কষ্টার্জিত জমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজে দিতে সম্মত হয়েছেন।

নিজের অর্জনের দিকে তাকালে তাঁর অবদান দেখতে পাই; ভাইদের ভবিষ্যতের কথা ভাবলে মনে পড়ে তাঁর পরিশ্রম; গোসাইনপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কথা এলে চোখে ভাসে তাঁর সেই সিদ্ধান্ত। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়- একই জীবনদর্শনের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ। তাঁর সংগ্রাম শুধু নিজের সংসার টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম ছিল না; সেই সংগ্রামের ভেতর থেকেই তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু করার মানসিকতা ধারণ করেছেন।

মুহাম্মদ তেরা মিয়ার জীবনকে এক বাক্যে বলতে হলে আমি বলব- তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অন্যের ভবিষ্যতের পথ তৈরি করেছেন। তাঁর গল্পে আছে গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতা, কৃষিশ্রমের কঠোরতা, স্ত্রীর দীর্ঘ অসুস্থতার বেদনা, সন্তানের শিক্ষার জন্য লড়াই, পিতৃস্নেহের কোমলতা আর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার কাজে সহযোগিতার গৌরব। এ কোনো রাজপ্রাসাদের গল্প নয়; এখানে নেই সম্পদের অহংকার বা ক্ষমতার দাপট। আছে একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ দায়িত্ববোধ। তিনি ইতিহাসের বিখ্যাত কেউ নন, তাঁকে নিয়ে সভা-সেমিনারও হয়নি; কিন্তু একটি পরিবারের ইতিহাসে তাঁর স্থান অনন্য, আর গোসাইনপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর ভূমিকা তাঁর জীবনসংগ্রামের এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।

আমি বিশ্বাস করি, সমাজে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন- কেউ শ্রম দিয়ে সন্তানকে শিক্ষিত করেন, কেউ সামান্য সঞ্চয় ব্যয় করেন, কেউ জমি দান করেন, কেউ পাশে দাঁড়িয়ে একটি উদ্যোগকে সফল করেন। তাঁদের জীবনকথা সামনে এলে আমরা নতুন করে বুঝব, একটি আলোকিত প্রজন্ম গড়ে ওঠার পেছনে কত মানুষের নীরব ত্যাগ কাজ করে।

আব্বা, আপনি আমার জীবন্ত পাঠশালাঃজীবনের পথে আমরা বহু শিক্ষকের কাছে শিখি; বই পড়ি, নানা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করি। কিন্তু কিছু শিক্ষা মেলে না বইয়ের পাতায়- মেলে মানুষের জীবনে, তাঁদের ত্যাগে, তাঁদের সংগ্রামে। আমার আব্বা আমার জীবনের তেমনই এক শিক্ষক।

তিনি শিখিয়েছেন, অভাব থাকা অপরাধ নয়; অভাবের কাছে স্বপ্নকে হারতে দেওয়াই পরাজয়। শিখিয়েছেন, নিজে শিক্ষিত না হয়েও শিক্ষার পক্ষে দাঁড়ানো যায়; সম্পদ সীমিত হলেও মহৎ কাজে শরিক হওয়া যায়; প্রতিকূলতার মধ্যেও দায়িত্ব পালন করে যাওয়া যায়। শিখিয়েছেন, মানুষের পরিচয় তার সামাজিক অবস্থানে নয়, তার চিন্তা, কর্ম ও অবদানে।

আজ আমি যদি মানুষের জন্য কিছু করতে চাই, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার স্বপ্ন দেখি, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ অনুভব করি- তবে এর পেছনেও আছে আব্বার জীবন থেকে পাওয়া শিক্ষা। তিনি কোনোদিন আনুষ্ঠানিকভাবে আমাকে এসব শেখাননি; তাঁর জীবনই শিখিয়েছে, নিজের অর্জনকে অন্যের কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলেই তা অর্থবহ হয়ে ওঠে। ভবিষ্যতে আমার জীবনে কতটুকু অর্জন যোগ হবে, মানুষের জন্য কতটুকু করতে পারব জানি না। শুধু জানি, আমার প্রতিটি ভালো কাজের পেছনে আব্বার শিক্ষার একটি অংশ থেকে যাবে।

মানুষ কতটা সম্পদশালী, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন সে কতটা মানুষ গড়তে পেরেছে, কতটা স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে, আর নিজের সামর্থ্য দিয়ে কল্যাণের কতটা পথ তৈরি করতে পেরেছে। এই বিচারে আমার আব্বা আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানুষ।

আল্লাহ তাআলা আমার আব্বা-আম্মাকে সুস্থতা, নেক হায়াত ও প্রশান্তিময় জীবন দান করুন। তাঁদের জীবনের কষ্টগুলোকে নেকিতে পরিণত করুন, ত্যাগের উত্তম প্রতিদান দিন এবং তাঁদের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালনের তাওফিক আমাকে ও আমার ভাইদের দান করুন। আমিন।

আব্বা, আপনার জীবনসংগ্রামের সবটুকু কোনো লেখায় ধরা সম্ভব নয়। তবু এই লেখার প্রতিটি শব্দে রইল আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার সামান্য প্রকাশ। আপনি শুধু আমার পিতা নন- আপনি আমার অস্তিত্বের শিকড়, আমার শিক্ষার নেপথ্যের কারিগর, আমার জীবনের এক জীবন্ত পাঠশালা


ডেইলি বাংল সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ মনিরুল ইসলাম । নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ মাহবুব হাসান পাটোয়ারী


কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ডেইলি সংবাদ