ডেইলি বাংল সংবাদ
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

হারিকেনের আলো থেকে ‘হাঁসের গ্রাম’: এক উদ্যোক্তার হাত ধরে বদলে গেছে পুরো গ্রামের ভাগ্য

হারিকেনের আলো থেকে ‘হাঁসের গ্রাম’: এক উদ্যোক্তার হাত ধরে বদলে গেছে পুরো গ্রামের ভাগ্য

হারিকেনের আলো থেকে ‘হাঁসের গ্রাম’: এক উদ্যোক্তার হাত ধরে বদলে গেছে পুরো গ্রামের ভাগ্য

মোঃআলামিন হোসেন তাড়াশ উপজেলা  (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি:- হারিকেনের ক্ষীণ আলো আর ধানের তুষ দিয়ে হাঁসের ডিম ফুটিয়ে শুরু হয়েছিল এক মানুষের স্বপ্নযাত্রা। সেই ছোট্ট উদ্যোগই আজ বদলে দিয়েছে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মহেশরৌহালী গ্রামের অর্থনীতি। বর্তমানে গ্রামটিতে প্রতিদিন এক লাখ থেকে দেড় লাখের বেশি হাঁসের বাচ্চা উৎপাদিত হচ্ছে। দেশের ৬৪ জেলায় সরবরাহ হচ্ছে এসব বাচ্চা। স্থানীয়দের কাছে গ্রামটি এখন পরিচিত 'হাঁসের গ্রাম' নামে।

এই সফলতার নেপথ্যের মানুষ শাহ আলম ফকির। দীর্ঘদিন আগে সীমিত পুঁজি আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে তিনি হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনের কাজ শুরু করেন। শুরুতে বিদ্যুৎ না থাকায় হারিকেনের আলো ও ধানের তুষের তাপে ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা উৎপাদন করতেন। নানা প্রতিকূলতা, লোকসান ও ব্যর্থতা পেরিয়ে ধীরে ধীরে তার সেই উদ্যোগ আজ একটি সম্ভাবনাময় শিল্পে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে মহেশরৌহালী গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে হাঁসের ডিম সংগ্রহ, বাচ্চা উৎপাদন, পরিচর্যা কিংবা বিপণনের সঙ্গে জড়িত। গ্রামে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে ডিমভর্তি ট্রে, আধুনিক ইনকিউবেটর মেশিন এবং সদ্য ফোটা হাঁসের বাচ্চার সারি। পুরো গ্রাম যেন একটি বিশাল হ্যাচারি শিল্পাঞ্চলে রূপ নিয়েছে।

শাহ আলম ফকির বলেন, "শুরুতে অনেক ডিম নষ্ট হয়েছে। অনেক কষ্ট করেছি। কিন্তু বিশ্বাস ছিল, একদিন সফল হবো। আমি একা স্বাবলম্বী হলে গল্পটা এত বড় হতো না। সবচেয়ে বেশি আনন্দ লাগে যখন দেখি গ্রামের অন্য মানুষও এই কাজ করে ভালো আছে।"

সময়ের সঙ্গে বদলেছে প্রযুক্তিও। হারিকেন ও ধানের তুষের জায়গা নিয়েছে আধুনিক ইনকিউবেটর। নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ২৮ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে ডিম থেকে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়েছে।

শাহ আলমের ছেলে রাকিব হাসান বর্তমানে ব্যবসার বড় অংশ পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, "ফেসবুক পেজের মাধ্যমে এখন দেশের প্রায় সব জেলা থেকেই অর্ডার আসে। সিলেট, কক্সবাজার, বরিশাল, খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত হাঁসের বাচ্চা পাঠানো হচ্ছে।"

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, মহেশরৌহালী গ্রামে প্রতিদিন এক লাখ থেকে দেড় লাখের বেশি হাঁসের বাচ্চা উৎপাদিত হয়। রাজশাহী, নাটোর, পাবনাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে হাঁসের ডিম সংগ্রহ করে এখানকার হ্যাচারিগুলোতে বাচ্চা উৎপাদন করা হয়। পরে সেগুলো দেশের ৬৪ জেলায় সরবরাহ করা হয়।

এই শিল্পকে কেন্দ্র করে গ্রামের বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। হ্যাচারির শ্রমিক খাইরুল ইসলাম বলেন, "আগে নিয়মিত কোনো কাজ ছিল না। এখন মাস শেষে বেতন পাই। সংসার ভালোভাবে চলছে। কাজেরও কোনো অভাব নেই।"

স্থানীয় বাসিন্দা জলিল উদ্দিন বলেন, "একসময় এই গ্রামে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। এখন প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে হাঁসের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। মানুষের জীবনযাত্রার মান আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে।"

রবিউল মিয়া বলেন, "আমাদের কৃষিনির্ভর গ্রামের মানুষের জন্য হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনই এখন আশীর্বাদ। এই ব্যবসাই গ্রামের মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জও। বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে ইনকিউবেটরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয়। আবার হাঁসের ডিমের দাম বেড়ে গেলে লাভের পরিমাণ কমে যায়।

হ্যাচারি মালিক জামাল উদ্দিন বলেন, "ভালো সময় যেমন আছে, তেমনি ঝুঁকিও রয়েছে। তারপরও এখন আর পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটাই আমাদের প্রধান পেশা।"

তাড়াশ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. বাদল মিয়া বলেন, "হাঁস খামারিদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারেন এবং ক্ষতির মুখে না পড়েন।

একসময় হারিকেনের আলোয় যে স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন শাহ আলম ফকির, আজ তা শুধু তার নিজের জীবনই নয়, বদলে দিয়েছে পুরো মহেশরৌহালী গ্রামের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও পরিচয়। একটি সাধারণ কৃষিনির্ভর গ্রাম আজ সারাদেশে পরিচিতি পেয়েছে 'হাঁসের গ্রাম' হিসেবে। এটি এখন গ্রামীণ উদ্যোক্তা ও আত্মনির্ভরতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
ডেইলি বাংল সংবাদ

শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬


হারিকেনের আলো থেকে ‘হাঁসের গ্রাম’: এক উদ্যোক্তার হাত ধরে বদলে গেছে পুরো গ্রামের ভাগ্য

প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুলাই ২০২৬

featured Image

হারিকেনের আলো থেকে ‘হাঁসের গ্রাম’: এক উদ্যোক্তার হাত ধরে বদলে গেছে পুরো গ্রামের ভাগ্য

মোঃআলামিন হোসেন তাড়াশ উপজেলা  (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি:- হারিকেনের ক্ষীণ আলো আর ধানের তুষ দিয়ে হাঁসের ডিম ফুটিয়ে শুরু হয়েছিল এক মানুষের স্বপ্নযাত্রা। সেই ছোট্ট উদ্যোগই আজ বদলে দিয়েছে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মহেশরৌহালী গ্রামের অর্থনীতি। বর্তমানে গ্রামটিতে প্রতিদিন এক লাখ থেকে দেড় লাখের বেশি হাঁসের বাচ্চা উৎপাদিত হচ্ছে। দেশের ৬৪ জেলায় সরবরাহ হচ্ছে এসব বাচ্চা। স্থানীয়দের কাছে গ্রামটি এখন পরিচিত 'হাঁসের গ্রাম' নামে।

এই সফলতার নেপথ্যের মানুষ শাহ আলম ফকির। দীর্ঘদিন আগে সীমিত পুঁজি আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে তিনি হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনের কাজ শুরু করেন। শুরুতে বিদ্যুৎ না থাকায় হারিকেনের আলো ও ধানের তুষের তাপে ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা উৎপাদন করতেন। নানা প্রতিকূলতা, লোকসান ও ব্যর্থতা পেরিয়ে ধীরে ধীরে তার সেই উদ্যোগ আজ একটি সম্ভাবনাময় শিল্পে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে মহেশরৌহালী গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে হাঁসের ডিম সংগ্রহ, বাচ্চা উৎপাদন, পরিচর্যা কিংবা বিপণনের সঙ্গে জড়িত। গ্রামে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে ডিমভর্তি ট্রে, আধুনিক ইনকিউবেটর মেশিন এবং সদ্য ফোটা হাঁসের বাচ্চার সারি। পুরো গ্রাম যেন একটি বিশাল হ্যাচারি শিল্পাঞ্চলে রূপ নিয়েছে।

শাহ আলম ফকির বলেন, "শুরুতে অনেক ডিম নষ্ট হয়েছে। অনেক কষ্ট করেছি। কিন্তু বিশ্বাস ছিল, একদিন সফল হবো। আমি একা স্বাবলম্বী হলে গল্পটা এত বড় হতো না। সবচেয়ে বেশি আনন্দ লাগে যখন দেখি গ্রামের অন্য মানুষও এই কাজ করে ভালো আছে।"

সময়ের সঙ্গে বদলেছে প্রযুক্তিও। হারিকেন ও ধানের তুষের জায়গা নিয়েছে আধুনিক ইনকিউবেটর। নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ২৮ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে ডিম থেকে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়েছে।

শাহ আলমের ছেলে রাকিব হাসান বর্তমানে ব্যবসার বড় অংশ পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, "ফেসবুক পেজের মাধ্যমে এখন দেশের প্রায় সব জেলা থেকেই অর্ডার আসে। সিলেট, কক্সবাজার, বরিশাল, খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত হাঁসের বাচ্চা পাঠানো হচ্ছে।"

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, মহেশরৌহালী গ্রামে প্রতিদিন এক লাখ থেকে দেড় লাখের বেশি হাঁসের বাচ্চা উৎপাদিত হয়। রাজশাহী, নাটোর, পাবনাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে হাঁসের ডিম সংগ্রহ করে এখানকার হ্যাচারিগুলোতে বাচ্চা উৎপাদন করা হয়। পরে সেগুলো দেশের ৬৪ জেলায় সরবরাহ করা হয়।

এই শিল্পকে কেন্দ্র করে গ্রামের বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। হ্যাচারির শ্রমিক খাইরুল ইসলাম বলেন, "আগে নিয়মিত কোনো কাজ ছিল না। এখন মাস শেষে বেতন পাই। সংসার ভালোভাবে চলছে। কাজেরও কোনো অভাব নেই।"

স্থানীয় বাসিন্দা জলিল উদ্দিন বলেন, "একসময় এই গ্রামে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। এখন প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে হাঁসের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। মানুষের জীবনযাত্রার মান আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে।"

রবিউল মিয়া বলেন, "আমাদের কৃষিনির্ভর গ্রামের মানুষের জন্য হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনই এখন আশীর্বাদ। এই ব্যবসাই গ্রামের মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জও। বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে ইনকিউবেটরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয়। আবার হাঁসের ডিমের দাম বেড়ে গেলে লাভের পরিমাণ কমে যায়।

হ্যাচারি মালিক জামাল উদ্দিন বলেন, "ভালো সময় যেমন আছে, তেমনি ঝুঁকিও রয়েছে। তারপরও এখন আর পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটাই আমাদের প্রধান পেশা।"

তাড়াশ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. বাদল মিয়া বলেন, "হাঁস খামারিদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারেন এবং ক্ষতির মুখে না পড়েন।

একসময় হারিকেনের আলোয় যে স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন শাহ আলম ফকির, আজ তা শুধু তার নিজের জীবনই নয়, বদলে দিয়েছে পুরো মহেশরৌহালী গ্রামের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও পরিচয়। একটি সাধারণ কৃষিনির্ভর গ্রাম আজ সারাদেশে পরিচিতি পেয়েছে 'হাঁসের গ্রাম' হিসেবে। এটি এখন গ্রামীণ উদ্যোক্তা ও আত্মনির্ভরতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।


ডেইলি বাংল সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ মনিরুল ইসলাম । নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ মাহবুব হাসান পাটোয়ারী


কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ডেইলি সংবাদ