চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পূরণে বাংলাদেশ কংগ্রেসের ১০ দফা সংস্কার প্রস্তাব
‘সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনই ছিল গণ-অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা’
এইচ এম গোলাম কিবরিয়া রাকিব বিশেষ সংবাদদাতা ঢাকা, ৫ আগস্ট: চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে আয়োজিত উন্মুক্ত আলোচনা সভায় রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার, আইনের শাসন, সুশাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, অবাধ নির্বাচন, দুর্নীতি দমন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কর্মসংস্থানসহ ১০ দফা সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করেছে বাংলাদেশ কংগ্রেস।
বাংলাদেশ কংগ্রেস, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের উদ্যোগে বুধবার রাজধানীর বাংলা মোটর মোড়ে ‘চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক এ উন্মুক্ত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ কংগ্রেস, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক নুরুল আমীন শাহীন। প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ কংগ্রেসের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট কাজী রেজাউল হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন দলের মহাসচিব অ্যাডভোকেট মো. ইয়ারুল ইসলাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিম রেজা বাচ্চু।
সভায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ কংগ্রেসের ভাইস-চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মো. শফিকুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. নাজমুল মোর্শেদ, অর্থ সম্পাদক মোস্তফা আনোয়ার ভুইয়া রিপন, দপ্তর সম্পাদক মো. তুষার রহমান, যুগ্ম ধর্ম ও উপজাতি বিষয়ক সম্পাদক মাওলানা গোলাম কিবরিয়া রাকিব, কুড়িগ্রাম জেলা সমন্বয়ক মো. বায়েজিদ বোস্তামী এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সাংগঠনিক সম্পাদক উপাধ্যক্ষ নুরুজ্জামান হীরা প্রমুখ।
‘গণ-অভ্যুত্থান ছিল ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা’ বক্তারা বলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানকে শুধু সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন হিসেবে দেখলে এর মূল চেতনা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে খাটো করা হবে। এটি ছিল ন্যায়বিচার, সুশাসন, জবাবদিহি, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, মানবিক মর্যাদা ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ।
গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তারা বলেন, তাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত পরিবর্তনকে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রূপান্তর করাই এখন রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
জনগণের প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার বক্তারা বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার অন্যতম বিষয় ছিল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, দলীয় প্রভাবমুক্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।
একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কার্যকর সংস্কার এবং মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রত্যাশাও জনগণের রয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
অর্থনীতি শক্তিশালী না হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা টেকসই হবে না সভায় দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বেকারত্ব, শিল্প ও বিনিয়োগের সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
বক্তারা বলেন, শক্তিশালী অর্থনীতি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, শিল্পবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে।
দেশীয় উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি বক্তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, দুর্নীতির ক্ষেত্রে কোনো দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পরিচয় বিবেচনায় না এনে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মেধা, দক্ষতা ও সততার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা। প্রশাসনের দলীয়করণ বন্ধ করে কার্যকর রাষ্ট্রীয় সেবা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক স্বাধীনতা, সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
তাদের মতে, জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা সভায় অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও সংস্কারের গতি ও বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হওয়া প্রয়োজন।
তারা বলেন, সরকারের কার্যক্রমের মূল্যায়ন কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণের উদ্দেশ্যে নয়; বরং জাতীয় স্বার্থ, জনগণের প্রত্যাশা ও নাগরিক দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে হওয়া উচিত।
‘প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার; বিভাজন নয়, জাতীয় ঐক্য’ জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ কোনো একক রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর নয়; এটি সব নাগরিকের দেশ।
তারা বলেন, প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ এবং বিভাজনের পরিবর্তে জাতীয় ঐক্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বক্তারা আরও বলেন, জনগণের শক্তিকে রাষ্ট্রগঠনের শক্তিতে রূপান্তর করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। উন্নত, সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গঠনে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও জনগণকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশ কংগ্রেসের ১০ দফা সংস্কার প্রস্তাব সভা শেষে উন্নত, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল বাংলাদেশ গঠনে বাংলাদেশ কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ১০ দফা সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরা হয়
১. আইনের শাসন, সুশাসন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কার্যকর সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। ২. স্বাধীন, শক্তিশালী ও দক্ষ নির্বাচন কমিশন গড়ে তুলে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা।
৩. বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা ও দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। ৪. দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ এবং দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা।
৫. দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি নিরাপত্তা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে শিল্প ও অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করা। ৬. দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, শিল্পায়ন সম্প্রসারণ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।
৭. কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতে যুগোপযোগী সংস্কার এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। ৮. প্রশাসনে মেধা, দক্ষতা ও সততার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করে দলীয়করণ বন্ধ করা।
৯. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে প্রকৃত অর্থে ক্ষমতায়নের মাধ্যমে বিকেন্দ্রীকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করা। ১০. জাতীয় ঐক্য, মানবিক মূল্যবোধ, গণতন্ত্র ও দেশপ্রেমভিত্তিক সুস্থ ধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
সভা শেষে বক্তারা বলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে বাস্তব রাষ্ট্রীয় সংস্কারে রূপ দিতে হলে শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জনগণের অধিকার, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে দল-মত নির্বিশেষে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলারও আহ্বান জানান তারা।

বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ আগস্ট ২০২৬
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পূরণে বাংলাদেশ কংগ্রেসের ১০ দফা সংস্কার প্রস্তাব
‘সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনই ছিল গণ-অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা’
এইচ এম গোলাম কিবরিয়া রাকিব বিশেষ সংবাদদাতা ঢাকা, ৫ আগস্ট: চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে আয়োজিত উন্মুক্ত আলোচনা সভায় রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার, আইনের শাসন, সুশাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, অবাধ নির্বাচন, দুর্নীতি দমন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কর্মসংস্থানসহ ১০ দফা সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করেছে বাংলাদেশ কংগ্রেস।
বাংলাদেশ কংগ্রেস, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের উদ্যোগে বুধবার রাজধানীর বাংলা মোটর মোড়ে ‘চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক এ উন্মুক্ত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ কংগ্রেস, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক নুরুল আমীন শাহীন। প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ কংগ্রেসের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট কাজী রেজাউল হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন দলের মহাসচিব অ্যাডভোকেট মো. ইয়ারুল ইসলাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিম রেজা বাচ্চু।
সভায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ কংগ্রেসের ভাইস-চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মো. শফিকুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. নাজমুল মোর্শেদ, অর্থ সম্পাদক মোস্তফা আনোয়ার ভুইয়া রিপন, দপ্তর সম্পাদক মো. তুষার রহমান, যুগ্ম ধর্ম ও উপজাতি বিষয়ক সম্পাদক মাওলানা গোলাম কিবরিয়া রাকিব, কুড়িগ্রাম জেলা সমন্বয়ক মো. বায়েজিদ বোস্তামী এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সাংগঠনিক সম্পাদক উপাধ্যক্ষ নুরুজ্জামান হীরা প্রমুখ।
‘গণ-অভ্যুত্থান ছিল ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা’ বক্তারা বলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানকে শুধু সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন হিসেবে দেখলে এর মূল চেতনা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে খাটো করা হবে। এটি ছিল ন্যায়বিচার, সুশাসন, জবাবদিহি, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, মানবিক মর্যাদা ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ।
গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তারা বলেন, তাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত পরিবর্তনকে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রূপান্তর করাই এখন রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
জনগণের প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার বক্তারা বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার অন্যতম বিষয় ছিল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, দলীয় প্রভাবমুক্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।
একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কার্যকর সংস্কার এবং মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রত্যাশাও জনগণের রয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
অর্থনীতি শক্তিশালী না হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা টেকসই হবে না সভায় দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বেকারত্ব, শিল্প ও বিনিয়োগের সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
বক্তারা বলেন, শক্তিশালী অর্থনীতি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, শিল্পবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে।
দেশীয় উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি বক্তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, দুর্নীতির ক্ষেত্রে কোনো দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পরিচয় বিবেচনায় না এনে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মেধা, দক্ষতা ও সততার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা। প্রশাসনের দলীয়করণ বন্ধ করে কার্যকর রাষ্ট্রীয় সেবা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক স্বাধীনতা, সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
তাদের মতে, জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা সভায় অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও সংস্কারের গতি ও বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হওয়া প্রয়োজন।
তারা বলেন, সরকারের কার্যক্রমের মূল্যায়ন কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণের উদ্দেশ্যে নয়; বরং জাতীয় স্বার্থ, জনগণের প্রত্যাশা ও নাগরিক দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে হওয়া উচিত।
‘প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার; বিভাজন নয়, জাতীয় ঐক্য’ জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ কোনো একক রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর নয়; এটি সব নাগরিকের দেশ।
তারা বলেন, প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ এবং বিভাজনের পরিবর্তে জাতীয় ঐক্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বক্তারা আরও বলেন, জনগণের শক্তিকে রাষ্ট্রগঠনের শক্তিতে রূপান্তর করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। উন্নত, সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গঠনে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও জনগণকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশ কংগ্রেসের ১০ দফা সংস্কার প্রস্তাব সভা শেষে উন্নত, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল বাংলাদেশ গঠনে বাংলাদেশ কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ১০ দফা সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরা হয়
১. আইনের শাসন, সুশাসন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কার্যকর সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। ২. স্বাধীন, শক্তিশালী ও দক্ষ নির্বাচন কমিশন গড়ে তুলে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা।
৩. বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা ও দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। ৪. দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ এবং দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা।
৫. দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি নিরাপত্তা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে শিল্প ও অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করা। ৬. দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, শিল্পায়ন সম্প্রসারণ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।
৭. কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতে যুগোপযোগী সংস্কার এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। ৮. প্রশাসনে মেধা, দক্ষতা ও সততার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করে দলীয়করণ বন্ধ করা।
৯. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে প্রকৃত অর্থে ক্ষমতায়নের মাধ্যমে বিকেন্দ্রীকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করা। ১০. জাতীয় ঐক্য, মানবিক মূল্যবোধ, গণতন্ত্র ও দেশপ্রেমভিত্তিক সুস্থ ধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
সভা শেষে বক্তারা বলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে বাস্তব রাষ্ট্রীয় সংস্কারে রূপ দিতে হলে শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জনগণের অধিকার, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে দল-মত নির্বিশেষে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলারও আহ্বান জানান তারা।

আপনার মতামত লিখুন