সরিষাবাড়ীতে বন বিভাগের লাইসেন্স ছাড়াই চলছে প্রায় ৮০ করাতকল
ট্রেড লাইসেন্স থাকলেও নেই বন বিভাগসহ প্রয়োজনীয় অনুমোদন
সরিষাবাড়ী (জামালপুর) প্রতিনিধি:- জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলায় বন বিভাগের লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৮০টি করাতকল (স’মিল) পরিচালিত হচ্ছে বলে করাতকল মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে। এসব করাতকলের কোনোটি সরকারি রেলওয়ের জমিতে, আবার কোনোটি ব্যক্তিমালিকানাধীন ও ভাড়া নেওয়া জমিতে স্থাপিত। কিছু করাতকল ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা থেকে ট্রেড লাইসেন্স কিংবা শিল্প লাইসেন্স নিলেও বন বিভাগের লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বন অধিদপ্তরের আইন-বিধির তালিকায় করাতকল পরিচালনার জন্য ‘করাত-কল (লাইসেন্স) বিধিমালা, ২০১২’ রয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী, করাতকল স্থাপন ও পরিচালনার আগে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় লাইসেন্স নিতে হয়। এ জন্য নির্ধারিত ফরমে আবেদন, জমির মালিকানা-সংক্রান্ত কাগজপত্র, ম্যাপ, ছবি ও লাইসেন্স ফি জমার চালানসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করতে হয়। আবেদন যাচাই-বাছাই ও সরেজমিন তদন্তের পর অনুমোদন সাপেক্ষে লাইসেন্স দেওয়ার বিধান রয়েছে।
ফলে ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স কিংবা শিল্প লাইসেন্স থাকলেই কোনো করাতকল বন বিভাগের লাইসেন্সের প্রয়োজনীয়তা থেকে অব্যাহতি পায় না। করাতকল পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধিমালার শর্ত পূরণ ও বন বিভাগের লাইসেন্স গ্রহণের বিষয়টি বাধ্যতামূলক।
বিধিমালায় করাতকল স্থাপনের স্থান নিয়েও বিধিনিষেধ রয়েছে। ২০১২ সালের বিধিমালার বিধি ৭ অনুযায়ী, পৌর এলাকা ছাড়া সংরক্ষিত, রক্ষিত, অধিগ্রহণকৃত বা অন্য কোনো সরকারি বনভূমির সীমানা থেকে ন্যূনতম ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপন বা পরিচালনা করা যাবে না। একইভাবে সরকারি অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বিনোদন পার্ক ও উদ্যানসহ নির্দিষ্ট স্থাপনার ন্যূনতম ২০০ মিটারের মধ্যেও করাতকল স্থাপনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে।
লাইসেন্স ছাড়া করাতকল পরিচালনা বা বিধিমালার শর্ত লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধ হিসেবে তালিকাভুক্ত করাতকলগুলোর বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে আইনগত প্রক্রিয়া নেওয়া হচ্ছে।
তবে সরিষাবাড়ীতে দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৮০টি করাতকল লাইসেন্স ছাড়াই চলার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে যেসব করাতকলের বিরুদ্ধে কোনো উচ্চ আদালতের রিট বা স্থগিতাদেশ নেই, সেগুলোর কার্যক্রম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ কতটা নেওয়া হয়েছে তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
এদিকে কাঠ ভাঙানোর মজুরির পাশাপাশি অবশিষ্ট লাকড়ি নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন গ্রাহক। তাদের দাবি, আগে কাঠ ভাঙানোর পর অবশিষ্ট লাকড়ি নিতে আলাদা অর্থ দিতে হতো না। বর্তমানে প্রতি সেফটে ১০ টাকা করে অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় ও বিশেষ দিবসের নামে বিভিন্ন দপ্তরে টাকা দেওয়ার কথা বলে গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত খরচ চাপানোর অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও বন বিভাগের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বন বিভাগের ডেপুটি রেঞ্জার ও সরিষাবাড়ীতে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা সরোয়ার জাহান বলেন, “অবৈধ করাতকলগুলোর তালিকা অনুযায়ী আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কয়েক মাস আগে তিনটি করাতকলকে জরিমানা করা হয়েছে। যেসব করাতকলের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সরিষাবাড়ী উপজেলা করাতকল মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ আব্দুল বারী ও সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম বলেন, করাতকলের লাইসেন্স গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত সহনীয় পর্যায়ে রেখে লাইসেন্স প্রদানের সুযোগ দেওয়া উচিত।
জামালপুর জেলা বন কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, “অবৈধ করাতকলের মালিকদের বন বিভাগ থেকে লাইসেন্স নেওয়ার জন্য তাগাদা অব্যাহত রয়েছে। তারা বিষয়টি আমলে না নিলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
সচেতন মহলের মতে, করাতকলের বৈধতা যাচাইয়ে শুধু ট্রেড লাইসেন্স বা জমির মালিকানা দেখলেই হবে না। বন বিভাগের লাইসেন্স, নির্ধারিত স্থানে করাতকল স্থাপনের শর্ত, পরিবেশগত অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা এবং কাঠের বৈধ উৎস সবকিছু যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিধিমালার শর্ত পূরণ করে লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য করাতকলগুলোকে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় লাইসেন্স দেওয়ার সুযোগ এবং লাইসেন্স না নিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সরিষাবাড়ীতে বন বিভাগের লাইসেন্স ছাড়াই চলছে প্রায় ৮০ করাতকল
ট্রেড লাইসেন্স থাকলেও নেই বন বিভাগসহ প্রয়োজনীয় অনুমোদন
সরিষাবাড়ী (জামালপুর) প্রতিনিধি:- জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলায় বন বিভাগের লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৮০টি করাতকল (স’মিল) পরিচালিত হচ্ছে বলে করাতকল মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে। এসব করাতকলের কোনোটি সরকারি রেলওয়ের জমিতে, আবার কোনোটি ব্যক্তিমালিকানাধীন ও ভাড়া নেওয়া জমিতে স্থাপিত। কিছু করাতকল ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা থেকে ট্রেড লাইসেন্স কিংবা শিল্প লাইসেন্স নিলেও বন বিভাগের লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বন অধিদপ্তরের আইন-বিধির তালিকায় করাতকল পরিচালনার জন্য ‘করাত-কল (লাইসেন্স) বিধিমালা, ২০১২’ রয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী, করাতকল স্থাপন ও পরিচালনার আগে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় লাইসেন্স নিতে হয়। এ জন্য নির্ধারিত ফরমে আবেদন, জমির মালিকানা-সংক্রান্ত কাগজপত্র, ম্যাপ, ছবি ও লাইসেন্স ফি জমার চালানসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করতে হয়। আবেদন যাচাই-বাছাই ও সরেজমিন তদন্তের পর অনুমোদন সাপেক্ষে লাইসেন্স দেওয়ার বিধান রয়েছে।
ফলে ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স কিংবা শিল্প লাইসেন্স থাকলেই কোনো করাতকল বন বিভাগের লাইসেন্সের প্রয়োজনীয়তা থেকে অব্যাহতি পায় না। করাতকল পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধিমালার শর্ত পূরণ ও বন বিভাগের লাইসেন্স গ্রহণের বিষয়টি বাধ্যতামূলক।
বিধিমালায় করাতকল স্থাপনের স্থান নিয়েও বিধিনিষেধ রয়েছে। ২০১২ সালের বিধিমালার বিধি ৭ অনুযায়ী, পৌর এলাকা ছাড়া সংরক্ষিত, রক্ষিত, অধিগ্রহণকৃত বা অন্য কোনো সরকারি বনভূমির সীমানা থেকে ন্যূনতম ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপন বা পরিচালনা করা যাবে না। একইভাবে সরকারি অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বিনোদন পার্ক ও উদ্যানসহ নির্দিষ্ট স্থাপনার ন্যূনতম ২০০ মিটারের মধ্যেও করাতকল স্থাপনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে।
লাইসেন্স ছাড়া করাতকল পরিচালনা বা বিধিমালার শর্ত লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধ হিসেবে তালিকাভুক্ত করাতকলগুলোর বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে আইনগত প্রক্রিয়া নেওয়া হচ্ছে।
তবে সরিষাবাড়ীতে দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৮০টি করাতকল লাইসেন্স ছাড়াই চলার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে যেসব করাতকলের বিরুদ্ধে কোনো উচ্চ আদালতের রিট বা স্থগিতাদেশ নেই, সেগুলোর কার্যক্রম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ কতটা নেওয়া হয়েছে তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
এদিকে কাঠ ভাঙানোর মজুরির পাশাপাশি অবশিষ্ট লাকড়ি নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন গ্রাহক। তাদের দাবি, আগে কাঠ ভাঙানোর পর অবশিষ্ট লাকড়ি নিতে আলাদা অর্থ দিতে হতো না। বর্তমানে প্রতি সেফটে ১০ টাকা করে অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় ও বিশেষ দিবসের নামে বিভিন্ন দপ্তরে টাকা দেওয়ার কথা বলে গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত খরচ চাপানোর অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও বন বিভাগের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বন বিভাগের ডেপুটি রেঞ্জার ও সরিষাবাড়ীতে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা সরোয়ার জাহান বলেন, “অবৈধ করাতকলগুলোর তালিকা অনুযায়ী আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কয়েক মাস আগে তিনটি করাতকলকে জরিমানা করা হয়েছে। যেসব করাতকলের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সরিষাবাড়ী উপজেলা করাতকল মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ আব্দুল বারী ও সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম বলেন, করাতকলের লাইসেন্স গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত সহনীয় পর্যায়ে রেখে লাইসেন্স প্রদানের সুযোগ দেওয়া উচিত।
জামালপুর জেলা বন কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, “অবৈধ করাতকলের মালিকদের বন বিভাগ থেকে লাইসেন্স নেওয়ার জন্য তাগাদা অব্যাহত রয়েছে। তারা বিষয়টি আমলে না নিলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
সচেতন মহলের মতে, করাতকলের বৈধতা যাচাইয়ে শুধু ট্রেড লাইসেন্স বা জমির মালিকানা দেখলেই হবে না। বন বিভাগের লাইসেন্স, নির্ধারিত স্থানে করাতকল স্থাপনের শর্ত, পরিবেশগত অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা এবং কাঠের বৈধ উৎস সবকিছু যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিধিমালার শর্ত পূরণ করে লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য করাতকলগুলোকে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় লাইসেন্স দেওয়ার সুযোগ এবং লাইসেন্স না নিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

আপনার মতামত লিখুন