শ্রমের ভারে নুয়ে পড়ুক না কোনো শিশুর শৈশব
মো: ছালিম আহমদ খান সিলেট:- শৈশব মানেই হাসি, আনন্দ, খেলাধুলা, শিক্ষার আলো আর অসীম সম্ভাবনায় ভরা একটি সুন্দর সময়। যে বয়সে একটি শিশুর হাতে থাকার কথা বই-খাতা, চোখে থাকার কথা নতুন কিছু শেখার স্বপ্ন, সে বয়সে যখন তার হাতে তুলে দেওয়া হয় শ্রমের সরঞ্জাম কিংবা জীবিকার কঠিন দায়িত্ব, তখন শুধু একটি শিশুর শৈশবই হারিয়ে যায় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি পরিবার, সমাজ এবং জাতির ভবিষ্যৎও। শিশুশ্রম তাই নিছক অর্থনৈতিক বাস্তবতা নয়; এটি শিশুর অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক বিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি সামাজিক সংকট।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। শিক্ষা, প্রযুক্তি, যোগাযোগব্যবস্থা ও জীবনযাত্রার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি সত্ত্বেও শিশুশ্রম এখনো আমাদের সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। দেশের বিভিন্ন শহর, বাজার, শিল্পাঞ্চল, গ্রামাঞ্চল ও কর্মক্ষেত্রে এমন অনেক শিশুকে দেখা যায়, যাদের বয়স অনুযায়ী বিদ্যালয়ে থাকার কথা, অথচ তারা পরিবারের জীবিকা নির্বাহের তাগিদে কাজে নিয়োজিত। কেউ হোটেল-রেস্তোরাঁয়, কেউ ছোট দোকান বা ওয়ার্কশপে, কেউ নির্মাণস্থলে, আবার কেউ কৃষিকাজ কিংবা গৃহস্থালির কাজে শ্রম দিচ্ছে। তাদের অনেকের দিন শুরু হয় অন্যদের ঘুম ভাঙার আগেই, আর শেষ হয় ক্লান্ত শরীরে দিনের কাজ সম্পন্ন করার পর। জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাদের বেড়ে ওঠার আনন্দ, শিক্ষার সুযোগ এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার অবকাশ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসে।
শিশুশ্রমের পেছনে দারিদ্র্য একটি বড় কারণ হলেও সমস্যাটিকে শুধু দারিদ্র্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে এর প্রকৃত চিত্র উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অসুস্থতা, কর্মসংস্থানের অভাব, ঋণের বোঝা, পারিবারিক ভাঙন, সামাজিক নিরাপত্তার ঘাটতি এবং শিক্ষার ব্যয় বহনের অসামর্থ্য অনেক শিশুকে অল্প বয়সেই উপার্জনের পথে ঠেলে দেয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে কম মজুরিতে শ্রম পাওয়ার প্রবণতা, শ্রম আইন সম্পর্কে অসচেতনতা এবং শিশুদের অসহায় অবস্থাকে কাজে লাগানোর মানসিকতা শিশুশ্রমকে টিকিয়ে রাখে। ফলে একটি শিশু কখনো নিজের ইচ্ছায় নয়, বরং পরিস্থিতির চাপে শ্রমে যুক্ত হয়। তার সামনে তখন শৈশব উপভোগ করা কিংবা পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে পরিবারের জন্য কিছু উপার্জন করাই বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন পরিবারের কাজে বয়সোপযোগী ও নিরাপদ সহযোগিতা করা এবং শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক বিকাশকে ব্যাহত করে এমন শ্রমে নিয়োজিত হওয়া এক বিষয় নয়। যে কাজ শিশুকে বিদ্যালয় থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে থাকতে বাধ্য করে, শারীরিক বা মানসিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করে কিংবা তাকে শোষণ ও নির্যাতনের মুখে ঠেলে দেয়, সেটিই গুরুতর উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করা শিশুদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। ভারী যন্ত্রপাতি, আগুন, ধারালো সরঞ্জাম, রাসায়নিক পদার্থ, অতিরিক্ত ধুলাবালি কিংবা অনিরাপদ নির্মাণস্থলে কাজ করতে গিয়ে তাদের দুর্ঘটনা ও অসুস্থতার শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কোনো কোনো শিশু দীর্ঘ সময় কাজ করেও ন্যায্য পারিশ্রমিক পায় না; কেউ অপমান ও অবহেলার শিকার হয়, আবার কেউ নির্যাতনের ভয়ে নিজের কষ্টের কথাও কাউকে বলতে পারে না।
শিশুশ্রমের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিগুলোর একটি হলো শিক্ষার সুযোগ হারিয়ে ফেলা। একটি শিশু যখন নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়ার পরিবর্তে কর্মস্থলে সময় কাটায়, তখন ধীরে ধীরে তার পড়াশোনার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। কাজের ক্লান্তি, সময়ের অভাব এবং মানসিক চাপের কারণে সে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে না। বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি বাড়তে বাড়তে অনেক সময় পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে ভবিষ্যতে দক্ষতা অর্জন, ভালো কর্মসংস্থান এবং নিজের জীবনকে উন্নত করার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। যে শিশু আজ পরিবারের অসচ্ছলতার কারণে শ্রমে যুক্ত হচ্ছে, শিক্ষার অভাবে আগামী দিনে তারও সীমিত আয়ের কাজে আটকে থাকার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এভাবে দারিদ্র্য শিশুকে শ্রমে ঠেলে দেয়, শ্রম তাকে শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, আর শিক্ষার অভাব আবারও দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ায়। এক প্রজন্মের সংকট এভাবেই পরবর্তী প্রজন্মের জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
শিশুর বিকাশ শুধু পড়াশোনা কিংবা শারীরিকভাবে বেড়ে ওঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তার মানসিক প্রশান্তি, সৃজনশীলতা, বন্ধুত্ব, খেলাধুলা, আনন্দ এবং নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার স্বাধীনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশু যখন সারাদিন কাজের চাপে থাকে, তখন তার স্বাভাবিক শৈশবের এই অপরিহার্য অংশগুলো হারিয়ে যেতে থাকে। দীর্ঘদিন অবহেলা, অপমান, ভয় কিংবা নির্যাতনের পরিবেশে থাকতে হলে তার আত্মবিশ্বাস ও মানসিক সুস্থতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই শিশুশ্রমকে কেবল কাজের বিনিময়ে অর্থ উপার্জনের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না; এর সঙ্গে একটি শিশুর ব্যক্তিত্ব, ভবিষ্যৎ এবং মানবিক বিকাশের প্রশ্নও জড়িত।
বাংলাদেশে শিশুশ্রমের ব্যাপ্তি সম্পর্কে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার বিভিন্ন জরিপ সমস্যাটির গুরুত্ব তুলে ধরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) ২০২৫-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রমের হার প্রায় ৯.২ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৯ সালের জরিপে এই হার ছিল ৬.৮ শতাংশ। অর্থাৎ, নতুন জরিপে শিশুশ্রমের হারে উদ্বেগজনক বৃদ্ধি দেখা গেছে। তবে এই পরিসংখ্যান জরিপে নির্ধারিত বয়স, কাজের সময় ও কার্যক্রমের মানদণ্ডের ভিত্তিতে হিসাব করা হয়েছে; তাই একে সব ধরনের শিশুশ্রমের প্রতিটি পরিস্থিতির পূর্ণ বিবরণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। তবুও এই তথ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শিশুশ্রম প্রতিরোধে আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
শিশুশ্রম প্রতিরোধে বাংলাদেশে আইনগত কাঠামো রয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ৩৪ ধারা অনুযায়ী, কোনো শিশু কোনো পেশা বা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ করা যাবে না কিংবা তাকে কাজ করতে দেওয়া যাবে না। এই আইনে শিশু ও কিশোরের বয়সের মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে; সাধারণভাবে ১৪ বছর পূর্ণ করা থেকে ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যক্তিকে কিশোর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিশোরকে কাজে নিয়োগের ক্ষেত্রে আইনে নির্ধারিত শর্ত, নিবন্ধিত চিকিৎসকের সক্ষমতা সনদ এবং অন্যান্য প্রযোজ্য বিধান অনুসরণ করতে হয়। একই আইনের ৩৯ ধারায় সরকার ঘোষিত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে কিশোর নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে শিশুশ্রম প্রতিরোধে শুধু আইন প্রণয়ন নয়, এর কার্যকর প্রয়োগ, কর্মক্ষেত্রে নজরদারি এবং ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শিক্ষা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করাও জরুরি।
তবে শিশুশ্রম বন্ধের নামে কোনো শিশুকে কর্মক্ষেত্র থেকে সরিয়ে দেওয়াই সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান নয়। তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা, শিক্ষায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ এবং নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তাও বিবেচনা করতে হবে। একটি শিশু কাজ হারানোর পর যদি তার পরিবার আরও সংকটে পড়ে, বিদ্যালয়ে ফেরার ব্যবস্থা না থাকে কিংবা মৌলিক চাহিদা পূরণ না হয়, তাহলে সে আবারও শ্রমে ফিরে যেতে পারে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের জন্য সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থানের সুযোগ, শিক্ষা সহায়তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। শিশুকে শাস্তি দেওয়া নয়, বরং তাকে শোষণ ও ঝুঁকি থেকে মুক্ত করে শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের পথে ফিরিয়ে আনাই হওয়া উচিত প্রতিটি উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
এই পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে পরিবার থেকেই। সন্তানকে পরিবারের আয়ের একটি উপায় হিসেবে দেখার পরিবর্তে তার শিক্ষা, বিকাশ ও ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কোনো পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে শিশুকে কাজে পাঠাতে বাধ্য হলে তাদের প্রতি শুধু দোষারোপ না করে সহায়তার পথ খুঁজে বের করা জরুরি। বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শনাক্ত করা, দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের শিক্ষায় সহায়তা করা, অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ জোরদার করা গেলে অনেক শিশুকে শ্রমে যুক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব। শিক্ষকদেরও অনিয়মিত উপস্থিতি কিংবা হঠাৎ পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার পেছনের কারণগুলো বোঝার চেষ্টা করতে হবে, যাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা সময়মতো পৌঁছে দেওয়া যায়।
একই সঙ্গে ব্যবসায়ী, নিয়োগকর্তা এবং ভোক্তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে শিশুদের বয়স, কাজের ধরন, কর্মঘণ্টা ও নিরাপত্তার বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। সস্তা শ্রমের সুবিধা নেওয়ার জন্য শিশুদের নিয়োগ করা কিংবা তাদের অসহায়ত্বকে কাজে লাগানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সরবরাহব্যবস্থায় শিশুশ্রমের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের শ্রমিকের অধিকার রক্ষার বিষয়ে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারে। সমাজের মানুষও দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক চর্চাকে উৎসাহিত করতে পারেন। তবে কোথাও শিশুশ্রমের ঘটনা দেখা গেলে শিশুটির পরিচয় প্রকাশ করে তাকে সামাজিক অপমানের মুখে ফেলা কিংবা তার ছবি ছড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়; বরং তার নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা প্রয়োজন।
শিশুশ্রম নির্মূলে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শনাক্ত করা, তাদের পরিবারকে সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা, বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা এবং নির্যাতনের শিকার শিশুদের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার মতো উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায় থেকেই শুরু করা সম্ভব। শ্রম পরিদর্শন কার্যক্রমের পাশাপাশি শিশু সুরক্ষায় অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা, কার্যকর তদন্ত এবং পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে। গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে শিশুশ্রমের ঘটনা তুলে ধরার পাশাপাশি সমস্যার কারণ, প্রতিরোধের উপায় এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের উদাহরণ জনসমক্ষে তুলে ধরা। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে শিশুর পরিচয় ও ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে শিশুর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের পাশাপাশি তার অধিকার নিশ্চিত করার বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। কোনো শিশুকে খাবার, পোশাক কিংবা আর্থিক সহায়তা দেওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। শিশুরা কেন বিদ্যালয় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, কী কারণে তারা শ্রমে যুক্ত হচ্ছে এবং তাদের জন্য কী ধরনের সহায়তা সবচেয়ে কার্যকর হবে, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তাদের ও তাদের পরিবারের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। শিশুর অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হলে অনেক সময় সমস্যার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা সহজ হয় এবং সহায়তার উদ্যোগও আরও কার্যকর হয়ে ওঠে।
একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিমাপে সীমাবদ্ধ নয়; সেই উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো দেশের শিশুরা কতটা নিরাপদ, কতটা শিক্ষিত এবং কতটা মর্যাদার সঙ্গে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে। যে সমাজ তার শিশুদের শৈশব রক্ষা করতে পারে, সেই সমাজই আগামী দিনের জন্য শক্তিশালী মানবিক ভিত্তি তৈরি করে। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, কৃষিবিদ, উদ্যোক্তা, শ্রমিক, গবেষক কিংবা রাষ্ট্রের নেতৃত্বদানকারী। তাদের সম্ভাবনা বিকশিত হওয়ার আগেই যদি শ্রম, শোষণ ও বঞ্চনার ভারে চাপা পড়ে, তবে সেই ক্ষতির প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, সমগ্র জাতির অগ্রযাত্রায়ও পড়বে।
শিশুশ্রম বন্ধ করা মানে শুধু শিশুর হাত থেকে কাজের সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া নয়; তার হাতে বই তুলে দেওয়া, বিদ্যালয়ে ফেরার পথ তৈরি করা, পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিশুকে অভাবের কারণে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিতে না হয়। প্রতিটি শিশুর জন্য শিক্ষা, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। এই দায়িত্ব কোনো একটি প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির একার নয়; এটি আমাদের সবার।
আজ তাই সময় এসেছে শিশুশ্রমকে স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেওয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার। একটি শিশুর কাঁধে জীবিকার বোঝা চাপিয়ে দিয়ে তার ভবিষ্যতের কাছে আমরা দায়মুক্ত হতে পারি না। পরিবারকে সহায়তা করতে হবে, নিয়োগকর্তাকে দায়িত্বশীল হতে হবে, আইনকে কার্যকর করতে হবে এবং সমাজকে শিশুদের অধিকার রক্ষায় সচেতন হতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগেই গড়ে উঠতে পারে এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে শিশুর পরিচয় শ্রমিক হিসেবে নয়, বরং অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
শিশুর হাতে থাকুক বই, চোখে থাকুক স্বপ্ন, জীবনে থাকুক নিরাপত্তা , শৈশব হোক সুরক্ষিত, শিশুশ্রমমুক্ত বাংলাদেশ হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬
শ্রমের ভারে নুয়ে পড়ুক না কোনো শিশুর শৈশব
মো: ছালিম আহমদ খান সিলেট:- শৈশব মানেই হাসি, আনন্দ, খেলাধুলা, শিক্ষার আলো আর অসীম সম্ভাবনায় ভরা একটি সুন্দর সময়। যে বয়সে একটি শিশুর হাতে থাকার কথা বই-খাতা, চোখে থাকার কথা নতুন কিছু শেখার স্বপ্ন, সে বয়সে যখন তার হাতে তুলে দেওয়া হয় শ্রমের সরঞ্জাম কিংবা জীবিকার কঠিন দায়িত্ব, তখন শুধু একটি শিশুর শৈশবই হারিয়ে যায় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি পরিবার, সমাজ এবং জাতির ভবিষ্যৎও। শিশুশ্রম তাই নিছক অর্থনৈতিক বাস্তবতা নয়; এটি শিশুর অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক বিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি সামাজিক সংকট।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। শিক্ষা, প্রযুক্তি, যোগাযোগব্যবস্থা ও জীবনযাত্রার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি সত্ত্বেও শিশুশ্রম এখনো আমাদের সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। দেশের বিভিন্ন শহর, বাজার, শিল্পাঞ্চল, গ্রামাঞ্চল ও কর্মক্ষেত্রে এমন অনেক শিশুকে দেখা যায়, যাদের বয়স অনুযায়ী বিদ্যালয়ে থাকার কথা, অথচ তারা পরিবারের জীবিকা নির্বাহের তাগিদে কাজে নিয়োজিত। কেউ হোটেল-রেস্তোরাঁয়, কেউ ছোট দোকান বা ওয়ার্কশপে, কেউ নির্মাণস্থলে, আবার কেউ কৃষিকাজ কিংবা গৃহস্থালির কাজে শ্রম দিচ্ছে। তাদের অনেকের দিন শুরু হয় অন্যদের ঘুম ভাঙার আগেই, আর শেষ হয় ক্লান্ত শরীরে দিনের কাজ সম্পন্ন করার পর। জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাদের বেড়ে ওঠার আনন্দ, শিক্ষার সুযোগ এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার অবকাশ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসে।
শিশুশ্রমের পেছনে দারিদ্র্য একটি বড় কারণ হলেও সমস্যাটিকে শুধু দারিদ্র্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে এর প্রকৃত চিত্র উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অসুস্থতা, কর্মসংস্থানের অভাব, ঋণের বোঝা, পারিবারিক ভাঙন, সামাজিক নিরাপত্তার ঘাটতি এবং শিক্ষার ব্যয় বহনের অসামর্থ্য অনেক শিশুকে অল্প বয়সেই উপার্জনের পথে ঠেলে দেয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে কম মজুরিতে শ্রম পাওয়ার প্রবণতা, শ্রম আইন সম্পর্কে অসচেতনতা এবং শিশুদের অসহায় অবস্থাকে কাজে লাগানোর মানসিকতা শিশুশ্রমকে টিকিয়ে রাখে। ফলে একটি শিশু কখনো নিজের ইচ্ছায় নয়, বরং পরিস্থিতির চাপে শ্রমে যুক্ত হয়। তার সামনে তখন শৈশব উপভোগ করা কিংবা পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে পরিবারের জন্য কিছু উপার্জন করাই বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন পরিবারের কাজে বয়সোপযোগী ও নিরাপদ সহযোগিতা করা এবং শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক বিকাশকে ব্যাহত করে এমন শ্রমে নিয়োজিত হওয়া এক বিষয় নয়। যে কাজ শিশুকে বিদ্যালয় থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে থাকতে বাধ্য করে, শারীরিক বা মানসিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করে কিংবা তাকে শোষণ ও নির্যাতনের মুখে ঠেলে দেয়, সেটিই গুরুতর উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করা শিশুদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। ভারী যন্ত্রপাতি, আগুন, ধারালো সরঞ্জাম, রাসায়নিক পদার্থ, অতিরিক্ত ধুলাবালি কিংবা অনিরাপদ নির্মাণস্থলে কাজ করতে গিয়ে তাদের দুর্ঘটনা ও অসুস্থতার শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কোনো কোনো শিশু দীর্ঘ সময় কাজ করেও ন্যায্য পারিশ্রমিক পায় না; কেউ অপমান ও অবহেলার শিকার হয়, আবার কেউ নির্যাতনের ভয়ে নিজের কষ্টের কথাও কাউকে বলতে পারে না।
শিশুশ্রমের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিগুলোর একটি হলো শিক্ষার সুযোগ হারিয়ে ফেলা। একটি শিশু যখন নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়ার পরিবর্তে কর্মস্থলে সময় কাটায়, তখন ধীরে ধীরে তার পড়াশোনার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। কাজের ক্লান্তি, সময়ের অভাব এবং মানসিক চাপের কারণে সে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে না। বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি বাড়তে বাড়তে অনেক সময় পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে ভবিষ্যতে দক্ষতা অর্জন, ভালো কর্মসংস্থান এবং নিজের জীবনকে উন্নত করার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। যে শিশু আজ পরিবারের অসচ্ছলতার কারণে শ্রমে যুক্ত হচ্ছে, শিক্ষার অভাবে আগামী দিনে তারও সীমিত আয়ের কাজে আটকে থাকার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এভাবে দারিদ্র্য শিশুকে শ্রমে ঠেলে দেয়, শ্রম তাকে শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, আর শিক্ষার অভাব আবারও দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ায়। এক প্রজন্মের সংকট এভাবেই পরবর্তী প্রজন্মের জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
শিশুর বিকাশ শুধু পড়াশোনা কিংবা শারীরিকভাবে বেড়ে ওঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তার মানসিক প্রশান্তি, সৃজনশীলতা, বন্ধুত্ব, খেলাধুলা, আনন্দ এবং নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার স্বাধীনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশু যখন সারাদিন কাজের চাপে থাকে, তখন তার স্বাভাবিক শৈশবের এই অপরিহার্য অংশগুলো হারিয়ে যেতে থাকে। দীর্ঘদিন অবহেলা, অপমান, ভয় কিংবা নির্যাতনের পরিবেশে থাকতে হলে তার আত্মবিশ্বাস ও মানসিক সুস্থতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই শিশুশ্রমকে কেবল কাজের বিনিময়ে অর্থ উপার্জনের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না; এর সঙ্গে একটি শিশুর ব্যক্তিত্ব, ভবিষ্যৎ এবং মানবিক বিকাশের প্রশ্নও জড়িত।
বাংলাদেশে শিশুশ্রমের ব্যাপ্তি সম্পর্কে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার বিভিন্ন জরিপ সমস্যাটির গুরুত্ব তুলে ধরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) ২০২৫-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রমের হার প্রায় ৯.২ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৯ সালের জরিপে এই হার ছিল ৬.৮ শতাংশ। অর্থাৎ, নতুন জরিপে শিশুশ্রমের হারে উদ্বেগজনক বৃদ্ধি দেখা গেছে। তবে এই পরিসংখ্যান জরিপে নির্ধারিত বয়স, কাজের সময় ও কার্যক্রমের মানদণ্ডের ভিত্তিতে হিসাব করা হয়েছে; তাই একে সব ধরনের শিশুশ্রমের প্রতিটি পরিস্থিতির পূর্ণ বিবরণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। তবুও এই তথ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শিশুশ্রম প্রতিরোধে আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
শিশুশ্রম প্রতিরোধে বাংলাদেশে আইনগত কাঠামো রয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ৩৪ ধারা অনুযায়ী, কোনো শিশু কোনো পেশা বা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ করা যাবে না কিংবা তাকে কাজ করতে দেওয়া যাবে না। এই আইনে শিশু ও কিশোরের বয়সের মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে; সাধারণভাবে ১৪ বছর পূর্ণ করা থেকে ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যক্তিকে কিশোর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিশোরকে কাজে নিয়োগের ক্ষেত্রে আইনে নির্ধারিত শর্ত, নিবন্ধিত চিকিৎসকের সক্ষমতা সনদ এবং অন্যান্য প্রযোজ্য বিধান অনুসরণ করতে হয়। একই আইনের ৩৯ ধারায় সরকার ঘোষিত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে কিশোর নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে শিশুশ্রম প্রতিরোধে শুধু আইন প্রণয়ন নয়, এর কার্যকর প্রয়োগ, কর্মক্ষেত্রে নজরদারি এবং ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শিক্ষা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করাও জরুরি।
তবে শিশুশ্রম বন্ধের নামে কোনো শিশুকে কর্মক্ষেত্র থেকে সরিয়ে দেওয়াই সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান নয়। তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা, শিক্ষায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ এবং নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তাও বিবেচনা করতে হবে। একটি শিশু কাজ হারানোর পর যদি তার পরিবার আরও সংকটে পড়ে, বিদ্যালয়ে ফেরার ব্যবস্থা না থাকে কিংবা মৌলিক চাহিদা পূরণ না হয়, তাহলে সে আবারও শ্রমে ফিরে যেতে পারে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের জন্য সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থানের সুযোগ, শিক্ষা সহায়তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। শিশুকে শাস্তি দেওয়া নয়, বরং তাকে শোষণ ও ঝুঁকি থেকে মুক্ত করে শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের পথে ফিরিয়ে আনাই হওয়া উচিত প্রতিটি উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
এই পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে পরিবার থেকেই। সন্তানকে পরিবারের আয়ের একটি উপায় হিসেবে দেখার পরিবর্তে তার শিক্ষা, বিকাশ ও ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কোনো পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে শিশুকে কাজে পাঠাতে বাধ্য হলে তাদের প্রতি শুধু দোষারোপ না করে সহায়তার পথ খুঁজে বের করা জরুরি। বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শনাক্ত করা, দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের শিক্ষায় সহায়তা করা, অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ জোরদার করা গেলে অনেক শিশুকে শ্রমে যুক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব। শিক্ষকদেরও অনিয়মিত উপস্থিতি কিংবা হঠাৎ পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার পেছনের কারণগুলো বোঝার চেষ্টা করতে হবে, যাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা সময়মতো পৌঁছে দেওয়া যায়।
একই সঙ্গে ব্যবসায়ী, নিয়োগকর্তা এবং ভোক্তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে শিশুদের বয়স, কাজের ধরন, কর্মঘণ্টা ও নিরাপত্তার বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। সস্তা শ্রমের সুবিধা নেওয়ার জন্য শিশুদের নিয়োগ করা কিংবা তাদের অসহায়ত্বকে কাজে লাগানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সরবরাহব্যবস্থায় শিশুশ্রমের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের শ্রমিকের অধিকার রক্ষার বিষয়ে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারে। সমাজের মানুষও দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক চর্চাকে উৎসাহিত করতে পারেন। তবে কোথাও শিশুশ্রমের ঘটনা দেখা গেলে শিশুটির পরিচয় প্রকাশ করে তাকে সামাজিক অপমানের মুখে ফেলা কিংবা তার ছবি ছড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়; বরং তার নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা প্রয়োজন।
শিশুশ্রম নির্মূলে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শনাক্ত করা, তাদের পরিবারকে সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা, বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা এবং নির্যাতনের শিকার শিশুদের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার মতো উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায় থেকেই শুরু করা সম্ভব। শ্রম পরিদর্শন কার্যক্রমের পাশাপাশি শিশু সুরক্ষায় অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা, কার্যকর তদন্ত এবং পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে। গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে শিশুশ্রমের ঘটনা তুলে ধরার পাশাপাশি সমস্যার কারণ, প্রতিরোধের উপায় এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের উদাহরণ জনসমক্ষে তুলে ধরা। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে শিশুর পরিচয় ও ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে শিশুর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের পাশাপাশি তার অধিকার নিশ্চিত করার বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। কোনো শিশুকে খাবার, পোশাক কিংবা আর্থিক সহায়তা দেওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। শিশুরা কেন বিদ্যালয় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, কী কারণে তারা শ্রমে যুক্ত হচ্ছে এবং তাদের জন্য কী ধরনের সহায়তা সবচেয়ে কার্যকর হবে, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তাদের ও তাদের পরিবারের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। শিশুর অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হলে অনেক সময় সমস্যার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা সহজ হয় এবং সহায়তার উদ্যোগও আরও কার্যকর হয়ে ওঠে।
একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিমাপে সীমাবদ্ধ নয়; সেই উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো দেশের শিশুরা কতটা নিরাপদ, কতটা শিক্ষিত এবং কতটা মর্যাদার সঙ্গে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে। যে সমাজ তার শিশুদের শৈশব রক্ষা করতে পারে, সেই সমাজই আগামী দিনের জন্য শক্তিশালী মানবিক ভিত্তি তৈরি করে। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, কৃষিবিদ, উদ্যোক্তা, শ্রমিক, গবেষক কিংবা রাষ্ট্রের নেতৃত্বদানকারী। তাদের সম্ভাবনা বিকশিত হওয়ার আগেই যদি শ্রম, শোষণ ও বঞ্চনার ভারে চাপা পড়ে, তবে সেই ক্ষতির প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, সমগ্র জাতির অগ্রযাত্রায়ও পড়বে।
শিশুশ্রম বন্ধ করা মানে শুধু শিশুর হাত থেকে কাজের সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া নয়; তার হাতে বই তুলে দেওয়া, বিদ্যালয়ে ফেরার পথ তৈরি করা, পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিশুকে অভাবের কারণে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিতে না হয়। প্রতিটি শিশুর জন্য শিক্ষা, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। এই দায়িত্ব কোনো একটি প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির একার নয়; এটি আমাদের সবার।
আজ তাই সময় এসেছে শিশুশ্রমকে স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেওয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার। একটি শিশুর কাঁধে জীবিকার বোঝা চাপিয়ে দিয়ে তার ভবিষ্যতের কাছে আমরা দায়মুক্ত হতে পারি না। পরিবারকে সহায়তা করতে হবে, নিয়োগকর্তাকে দায়িত্বশীল হতে হবে, আইনকে কার্যকর করতে হবে এবং সমাজকে শিশুদের অধিকার রক্ষায় সচেতন হতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগেই গড়ে উঠতে পারে এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে শিশুর পরিচয় শ্রমিক হিসেবে নয়, বরং অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
শিশুর হাতে থাকুক বই, চোখে থাকুক স্বপ্ন, জীবনে থাকুক নিরাপত্তা , শৈশব হোক সুরক্ষিত, শিশুশ্রমমুক্ত বাংলাদেশ হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।

আপনার মতামত লিখুন