*ফারায়েজে ন্যায়বিচার:* কুরআন-সুন্নাহ, চার মাযহাব ও “দাদী-নাতনি” প্রসঙ্গের একটি বিশ্লেষণ
মুসলিম সমাজে সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে বিরোধ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হলো ফারায়েজ সম্পর্কে অজ্ঞতা। অথচ ইসলাম এই বণ্টনব্যবস্থাকে আল্লাহ নির্ধারিত একটি অপরিবর্তনীয় বিধান হিসেবে নির্ধারণ করেছে।
*পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা:*
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:
“يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ ۖ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ ...”
(সূরা আন-নিসা: ১১)
অর্থ: আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন—একজন পুত্রের অংশ দুইজন কন্যার সমান।
আরও বলেন:
“تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ ۚ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ...”
(সূরা আন-নিসা: ১৩)
অর্থ: এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা।
*পবিত্র হাদিসের নির্দেশনা:*
রাসূলুল্লাহ ( সা:) বলেন:
“أَلْحِقُوا الْفَرَائِضَ بِأَهْلِهَا...”
(সহীহ বুখারি)
অর্থ: ফারায়েজ অনুযায়ী অংশ তাদের প্রাপকদের পৌঁছে দাও।
“تَعَلَّمُوا الْفَرَائِضَ وَعَلِّمُوهَا...” (তিরমিজি)
অর্থ: ফারায়েজ শিক্ষা করো এবং শিক্ষা দাও।
*চার মাযহাবের ঐকমত্য:*
হানাফি মাযহাব, মালিকি মাযহাব, শাফেয়ি মাযহাব এবং হাম্বলি মাযহাব—সব মাযহাবই একমত যে কুরআনের নির্ধারিত অংশ পরিবর্তনযোগ্য নয়, নিকট আত্মীয় দূর আত্মীয়কে বঞ্চিত করে এবং হিবা ও উত্তরাধিকার পৃথক বিষয়।
*বাস্তব সমস্যা (দাদী কেন্দ্রিক):*
একজন দাদী ইন্তেকাল করেন। তার এক ছেলে পূর্বেই ইন্তেকাল করেছেন। দুই কন্যা জীবিত আছেন। মৃত ছেলের একটি কন্যা (নাতনি) রয়েছে। দাদী জীবিত অবস্থায় নাতনির নামে কিছু সম্পত্তি দলিল করে দিয়েছেন।
প্রথমত, উত্তরাধিকার (ফারায়েজ) অনুযায়ী দুই কন্যা সম্পূর্ণ সম্পত্তির অধিকারী হবেন। নাতনি উত্তরাধিকার পাবেন না। কারণ, নিকটতম উত্তরাধিকারী কন্যা উপস্থিত থাকলে নাতনি বঞ্চিত হয়।
দ্বিতীয়ত, দাদী জীবিত অবস্থায় নাতনিকে যে সম্পত্তি দিয়েছেন তা হিবা হিসেবে গণ্য হবে। এটি বৈধ এবং উত্তরাধিকারভুক্ত নয়; বরং তা নাতনির স্বতন্ত্র সম্পত্তি হিসেবে বহাল থাকবে।
হাদিসে এসেছে: “اعدلوا بين أولادكم...” (সহীহ বুখারি) অর্থাৎ তোমরা তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়ভাবে দান করো।নাতনি শুধুমাত্র হিবাকৃত সম্পত্তির মালিক। দুই কন্যা অবশিষ্ট সম্পত্তির পূর্ণ মালিক।
নাতনি বঞ্চিত, তাই তাকে অংশ দিতেই হবে—এ ধারণা ভুল।আগে দেওয়া সম্পত্তি হিসাব থেকে বাদ দিতে হবে—এ ধারণাও ভুল।মেয়েদের কম দেওয়া যাবে—এটি কুরআনবিরোধী ও হারাম।মৌখিক বণ্টনই যথেষ্ট—এ ধারণা ভুল; লিখিত দলিল জরুরি।
মৃত: দাদী।উত্তরাধিকারী: দুই কন্যা।বিশেষ উল্লেখ: নাতনির নামে জীবদ্দশায় হিবা করা সম্পত্তি উত্তরাধিকারভুক্ত নয়।
অবশিষ্ট সম্পত্তি দুই কন্যার মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হবে।বাংলাদেশের আইনগত দিক রেজিস্ট্রিকৃত হিবা বৈধ। ফারায়েজ মৃত্যুর পর অবশিষ্ট সম্পত্তিতে প্রযোজ্য। দলিল রেজিস্ট্রি পারিবারিক বিরোধ কমায়।
ফারায়েজ আল্লাহ নির্ধারিত একটি ন্যায়বিচারমূলক ব্যবস্থা। এখানে আবেগ নয়, বরং আল্লাহর বিধানই চূড়ান্ত। তবে ইসলাম মানবিক সমাধান হিসেবে হিবার পথ উন্মুক্ত রেখেছে।
ফারায়েজ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা সময়ের দাবি। কারণ অজ্ঞতা থেকেই অন্যায়, আর অন্যায় থেকেই বিরোধ।আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর বিধান সঠিকভাবে বুঝে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
ওয়াসসালাম।মুহাদ্দিস এইচ এম গোলাম কিবরিয়া রাকিব প্রতিষ্ঠাতা—মাওলানা আবদুল হাকিম রহ ফাউন্ডেশন।কুমিল্লা জিলা মাদরাসা।খতিব, প্রাবন্ধিক ও টিভি প্রোগ্রাম উপস্থাপক।

বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ এপ্রিল ২০২৬
*ফারায়েজে ন্যায়বিচার:* কুরআন-সুন্নাহ, চার মাযহাব ও “দাদী-নাতনি” প্রসঙ্গের একটি বিশ্লেষণ
মুসলিম সমাজে সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে বিরোধ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হলো ফারায়েজ সম্পর্কে অজ্ঞতা। অথচ ইসলাম এই বণ্টনব্যবস্থাকে আল্লাহ নির্ধারিত একটি অপরিবর্তনীয় বিধান হিসেবে নির্ধারণ করেছে।
*পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা:*
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:
“يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ ۖ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ ...”
(সূরা আন-নিসা: ১১)
অর্থ: আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন—একজন পুত্রের অংশ দুইজন কন্যার সমান।
আরও বলেন:
“تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ ۚ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ...”
(সূরা আন-নিসা: ১৩)
অর্থ: এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা।
*পবিত্র হাদিসের নির্দেশনা:*
রাসূলুল্লাহ ( সা:) বলেন:
“أَلْحِقُوا الْفَرَائِضَ بِأَهْلِهَا...”
(সহীহ বুখারি)
অর্থ: ফারায়েজ অনুযায়ী অংশ তাদের প্রাপকদের পৌঁছে দাও।
“تَعَلَّمُوا الْفَرَائِضَ وَعَلِّمُوهَا...” (তিরমিজি)
অর্থ: ফারায়েজ শিক্ষা করো এবং শিক্ষা দাও।
*চার মাযহাবের ঐকমত্য:*
হানাফি মাযহাব, মালিকি মাযহাব, শাফেয়ি মাযহাব এবং হাম্বলি মাযহাব—সব মাযহাবই একমত যে কুরআনের নির্ধারিত অংশ পরিবর্তনযোগ্য নয়, নিকট আত্মীয় দূর আত্মীয়কে বঞ্চিত করে এবং হিবা ও উত্তরাধিকার পৃথক বিষয়।
*বাস্তব সমস্যা (দাদী কেন্দ্রিক):*
একজন দাদী ইন্তেকাল করেন। তার এক ছেলে পূর্বেই ইন্তেকাল করেছেন। দুই কন্যা জীবিত আছেন। মৃত ছেলের একটি কন্যা (নাতনি) রয়েছে। দাদী জীবিত অবস্থায় নাতনির নামে কিছু সম্পত্তি দলিল করে দিয়েছেন।
প্রথমত, উত্তরাধিকার (ফারায়েজ) অনুযায়ী দুই কন্যা সম্পূর্ণ সম্পত্তির অধিকারী হবেন। নাতনি উত্তরাধিকার পাবেন না। কারণ, নিকটতম উত্তরাধিকারী কন্যা উপস্থিত থাকলে নাতনি বঞ্চিত হয়।
দ্বিতীয়ত, দাদী জীবিত অবস্থায় নাতনিকে যে সম্পত্তি দিয়েছেন তা হিবা হিসেবে গণ্য হবে। এটি বৈধ এবং উত্তরাধিকারভুক্ত নয়; বরং তা নাতনির স্বতন্ত্র সম্পত্তি হিসেবে বহাল থাকবে।
হাদিসে এসেছে: “اعدلوا بين أولادكم...” (সহীহ বুখারি) অর্থাৎ তোমরা তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়ভাবে দান করো।নাতনি শুধুমাত্র হিবাকৃত সম্পত্তির মালিক। দুই কন্যা অবশিষ্ট সম্পত্তির পূর্ণ মালিক।
নাতনি বঞ্চিত, তাই তাকে অংশ দিতেই হবে—এ ধারণা ভুল।আগে দেওয়া সম্পত্তি হিসাব থেকে বাদ দিতে হবে—এ ধারণাও ভুল।মেয়েদের কম দেওয়া যাবে—এটি কুরআনবিরোধী ও হারাম।মৌখিক বণ্টনই যথেষ্ট—এ ধারণা ভুল; লিখিত দলিল জরুরি।
মৃত: দাদী।উত্তরাধিকারী: দুই কন্যা।বিশেষ উল্লেখ: নাতনির নামে জীবদ্দশায় হিবা করা সম্পত্তি উত্তরাধিকারভুক্ত নয়।
অবশিষ্ট সম্পত্তি দুই কন্যার মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হবে।বাংলাদেশের আইনগত দিক রেজিস্ট্রিকৃত হিবা বৈধ। ফারায়েজ মৃত্যুর পর অবশিষ্ট সম্পত্তিতে প্রযোজ্য। দলিল রেজিস্ট্রি পারিবারিক বিরোধ কমায়।
ফারায়েজ আল্লাহ নির্ধারিত একটি ন্যায়বিচারমূলক ব্যবস্থা। এখানে আবেগ নয়, বরং আল্লাহর বিধানই চূড়ান্ত। তবে ইসলাম মানবিক সমাধান হিসেবে হিবার পথ উন্মুক্ত রেখেছে।
ফারায়েজ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা সময়ের দাবি। কারণ অজ্ঞতা থেকেই অন্যায়, আর অন্যায় থেকেই বিরোধ।আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর বিধান সঠিকভাবে বুঝে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
ওয়াসসালাম।মুহাদ্দিস এইচ এম গোলাম কিবরিয়া রাকিব প্রতিষ্ঠাতা—মাওলানা আবদুল হাকিম রহ ফাউন্ডেশন।কুমিল্লা জিলা মাদরাসা।খতিব, প্রাবন্ধিক ও টিভি প্রোগ্রাম উপস্থাপক।

আপনার মতামত লিখুন