সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে আলোর পথে মনপুরা: ৯০ হাজার মানুষের স্বপ্নপূরণের দ্বারপ্রান্তে দ্বীপ উপজেলা
মুহাঃ আশরাফুল ইসলাম মনপুরা উপজেলা প্রতিনিধি:- প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা, প্রায় পাঁচশত বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরা অবশেষে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হওয়ার পথে। দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগকে ঘিরে পুরো মনপুরাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিদ্যুৎ বিভাগের আওতায় এবং West Zone Power Distribution Company Limited (ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড)-এর বাস্তবায়নে "মনপুরা দ্বীপে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ (MIUEPDS)" প্রকল্পের অধীনে আন্তর্জাতিক মানের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ডিজেলনির্ভর সীমিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার পরিবর্তে মনপুরাবাসী পাবে নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সুবিধা।
স্থানীয়দের মতে, এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন ভোলা-৪ (চরফ্যাশন-মনপুরা) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়ন। নির্বাচনের পূর্বে তিনি মনপুরাবাসীর কাছে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার যে অঙ্গীকার করেছিলেন, তা বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। নির্বাচিত হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুতের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসা ঢাকাস্থ মনপুরা উন্নয়ন ফোরাম (DMUF) এই উদ্যোগকে মনপুরাবাসীর বহু প্রতীক্ষিত স্বপ্নপূরণের সূচনা হিসেবে দেখছে। সংগঠনটির সভাপতি আলী জাহ্ আহমেদ মিজান ও সাধারণ সম্পাদক মো. আলাউদ্দীন আহমেদ মোল্লার নেতৃত্বে বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন, আলোচনা সভা, স্মারকলিপি প্রদান এবং জাতীয় প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালিত হয়েছে। বিশেষ করে গত বছরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিদ্যুতের দাবিতে সংগঠনটি আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
প্রকাশিত দরপত্র অনুযায়ী, টার্নকি ভিত্তিতে ৩৩ কেভি সাবমেরিন কেবলের নকশা প্রণয়ন, সরবরাহ, স্থাপন, পরীক্ষণ ও কমিশনিংয়ের সম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করা হবে। প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি ৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ৪টি রানসহ মোট ২৮ কিলোমিটার সাবমেরিন কেবল স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ল্যান্ডিং স্টেশন নির্মাণ করা হবে, যা বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য করে তুলবে।
দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কঠোর কারিগরি যোগ্যতার শর্তও নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ১০ বছরের মধ্যে কমপক্ষে দুটি অনুরূপ প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা, ৩৩ কেভি বা তার অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন সাবমেরিন কেবল স্থাপন ও চালুকরণের সক্ষমতা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে কাজের অভিজ্ঞতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মনপুরার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নতুন যুগের সূচনা হবে। দীর্ঘদিন ধরে সীমিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষুদ্র শিল্প, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পর্যটন খাত কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সংযোগ চালু হলে এসব খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবার প্রসার ঘটবে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসবে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ব্যবসা-বাণিজ্য, মৎস্য খাত ও তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর সেবায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে মনপুরা যুক্ত হবে আধুনিক ও টেকসই অবকাঠামোগত উন্নয়নের ধারায়।
মনপুরাবাসীর ভাষ্য, সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সংযোগ বাস্তবায়িত হলে এটি হবে দ্বীপটির ইতিহাসে অন্যতম বড় উন্নয়ন প্রকল্প। বহু বছরের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করায় দ্বীপজুড়ে বইছে আনন্দের হাওয়া, আর নতুন আশায় বুক বাঁধছে মনপুরার মানুষ।

শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ মে ২০২৬
সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে আলোর পথে মনপুরা: ৯০ হাজার মানুষের স্বপ্নপূরণের দ্বারপ্রান্তে দ্বীপ উপজেলা
মুহাঃ আশরাফুল ইসলাম মনপুরা উপজেলা প্রতিনিধি:- প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা, প্রায় পাঁচশত বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরা অবশেষে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হওয়ার পথে। দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগকে ঘিরে পুরো মনপুরাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিদ্যুৎ বিভাগের আওতায় এবং West Zone Power Distribution Company Limited (ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড)-এর বাস্তবায়নে "মনপুরা দ্বীপে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ (MIUEPDS)" প্রকল্পের অধীনে আন্তর্জাতিক মানের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ডিজেলনির্ভর সীমিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার পরিবর্তে মনপুরাবাসী পাবে নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সুবিধা।
স্থানীয়দের মতে, এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন ভোলা-৪ (চরফ্যাশন-মনপুরা) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়ন। নির্বাচনের পূর্বে তিনি মনপুরাবাসীর কাছে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার যে অঙ্গীকার করেছিলেন, তা বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। নির্বাচিত হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুতের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসা ঢাকাস্থ মনপুরা উন্নয়ন ফোরাম (DMUF) এই উদ্যোগকে মনপুরাবাসীর বহু প্রতীক্ষিত স্বপ্নপূরণের সূচনা হিসেবে দেখছে। সংগঠনটির সভাপতি আলী জাহ্ আহমেদ মিজান ও সাধারণ সম্পাদক মো. আলাউদ্দীন আহমেদ মোল্লার নেতৃত্বে বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন, আলোচনা সভা, স্মারকলিপি প্রদান এবং জাতীয় প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালিত হয়েছে। বিশেষ করে গত বছরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিদ্যুতের দাবিতে সংগঠনটি আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
প্রকাশিত দরপত্র অনুযায়ী, টার্নকি ভিত্তিতে ৩৩ কেভি সাবমেরিন কেবলের নকশা প্রণয়ন, সরবরাহ, স্থাপন, পরীক্ষণ ও কমিশনিংয়ের সম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করা হবে। প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি ৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ৪টি রানসহ মোট ২৮ কিলোমিটার সাবমেরিন কেবল স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ল্যান্ডিং স্টেশন নির্মাণ করা হবে, যা বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য করে তুলবে।
দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কঠোর কারিগরি যোগ্যতার শর্তও নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ১০ বছরের মধ্যে কমপক্ষে দুটি অনুরূপ প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা, ৩৩ কেভি বা তার অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন সাবমেরিন কেবল স্থাপন ও চালুকরণের সক্ষমতা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে কাজের অভিজ্ঞতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মনপুরার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নতুন যুগের সূচনা হবে। দীর্ঘদিন ধরে সীমিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষুদ্র শিল্প, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পর্যটন খাত কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সংযোগ চালু হলে এসব খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবার প্রসার ঘটবে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসবে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ব্যবসা-বাণিজ্য, মৎস্য খাত ও তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর সেবায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে মনপুরা যুক্ত হবে আধুনিক ও টেকসই অবকাঠামোগত উন্নয়নের ধারায়।
মনপুরাবাসীর ভাষ্য, সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সংযোগ বাস্তবায়িত হলে এটি হবে দ্বীপটির ইতিহাসে অন্যতম বড় উন্নয়ন প্রকল্প। বহু বছরের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করায় দ্বীপজুড়ে বইছে আনন্দের হাওয়া, আর নতুন আশায় বুক বাঁধছে মনপুরার মানুষ।

আপনার মতামত লিখুন