সড়কে মৃত্যুর মিছিল: দুর্ঘটনা কমছে না কেন?
রংপুর সদর প্রতিনিধি,রংপুর:- বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল জাতীয় সমস্যা। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে এবং আরও বহু মানুষ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বা শারীরিক অক্ষমতার শিকার হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে সরকার সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন, সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করলেও দুর্ঘটনার সংখ্যা প্রত্যাশিত হারে কমছে না। ফলে প্রশ্ন উঠছে—কেন থামছে না সড়কে মৃত্যুর এই মিছিল?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে একক কোনো কারণ নয়, বরং একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে চালকদের অসচেতনতা, বেপরোয়া গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য করা, সড়কের ত্রুটি, যানবাহনের ফিটনেস সংকট এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ হলো অতিরিক্ত গতি। যাত্রী বেশি নেওয়া কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতায় অনেক চালক ঝুঁকিপূর্ণভাবে যানবাহন চালান। বিশেষ করে মহাসড়কে বাস ও ট্রাকের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক গতির কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়। অনেক সময় চালকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স থাকলেও নিরাপদ ড্রাইভিংয়ের নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না।
চালকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক চালক দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত গাড়ি চালিয়ে থাকেন। ফলে শারীরিক ক্লান্তি, মানসিক চাপ এবং ঘুমের অভাব তাদের মনোযোগ কমিয়ে দেয়। এর ফলে হঠাৎ কোনো পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হন তারা, যা দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে দেশের অনেক সড়ক এখনও নিরাপদ নয়। বিভিন্ন স্থানে রাস্তার গর্ত, ভাঙাচোরা অংশ, অপর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং প্রয়োজনীয় সাইনবোর্ডের অভাব দেখা যায়। শহর ও মহাসড়কে অনেক পথচারী বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হন, কারণ সেখানে ফুটওভার ব্রিজ বা জেব্রা ক্রসিং পর্যাপ্ত নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো নিশ্চিত না করলে দুর্ঘটনা কমানো কঠিন।
যানবাহনের ফিটনেসও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। অনেক পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন এখনও সড়কে চলাচল করছে। ব্রেক, টায়ার বা অন্যান্য যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। যদিও নিয়ম অনুযায়ী যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা বাধ্যতামূলক, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় না।
সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পথচারীদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাফিক নিয়ম সম্পর্কে অজ্ঞতা বা অসচেতনতার কারণে অনেক পথচারী নির্ধারিত স্থান ব্যবহার না করে রাস্তা পারাপার করেন। একইভাবে মোটরসাইকেল আরোহীদের মধ্যে হেলমেট ব্যবহার না করা, তিনজন বা তার বেশি যাত্রী বহন করা এবং ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করার প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন। চালকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে কোনো ধরনের শিথিলতা না দেখিয়ে কার্যকর নজরদারি জোরদার করতে হবে।
সড়কে প্রতিটি মৃত্যু একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয় এবং সমাজের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির সৃষ্টি করে। তাই সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে সরকার, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ জনগণ—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা এখন শুধু একটি দাবি নয়, বরং একটি জাতীয় প্রয়োজন।

বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুন ২০২৬
সড়কে মৃত্যুর মিছিল: দুর্ঘটনা কমছে না কেন?
রংপুর সদর প্রতিনিধি,রংপুর:- বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল জাতীয় সমস্যা। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে এবং আরও বহু মানুষ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বা শারীরিক অক্ষমতার শিকার হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে সরকার সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন, সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করলেও দুর্ঘটনার সংখ্যা প্রত্যাশিত হারে কমছে না। ফলে প্রশ্ন উঠছে—কেন থামছে না সড়কে মৃত্যুর এই মিছিল?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে একক কোনো কারণ নয়, বরং একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে চালকদের অসচেতনতা, বেপরোয়া গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য করা, সড়কের ত্রুটি, যানবাহনের ফিটনেস সংকট এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ হলো অতিরিক্ত গতি। যাত্রী বেশি নেওয়া কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতায় অনেক চালক ঝুঁকিপূর্ণভাবে যানবাহন চালান। বিশেষ করে মহাসড়কে বাস ও ট্রাকের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক গতির কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়। অনেক সময় চালকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স থাকলেও নিরাপদ ড্রাইভিংয়ের নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না।
চালকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক চালক দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত গাড়ি চালিয়ে থাকেন। ফলে শারীরিক ক্লান্তি, মানসিক চাপ এবং ঘুমের অভাব তাদের মনোযোগ কমিয়ে দেয়। এর ফলে হঠাৎ কোনো পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হন তারা, যা দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে দেশের অনেক সড়ক এখনও নিরাপদ নয়। বিভিন্ন স্থানে রাস্তার গর্ত, ভাঙাচোরা অংশ, অপর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং প্রয়োজনীয় সাইনবোর্ডের অভাব দেখা যায়। শহর ও মহাসড়কে অনেক পথচারী বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হন, কারণ সেখানে ফুটওভার ব্রিজ বা জেব্রা ক্রসিং পর্যাপ্ত নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো নিশ্চিত না করলে দুর্ঘটনা কমানো কঠিন।
যানবাহনের ফিটনেসও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। অনেক পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন এখনও সড়কে চলাচল করছে। ব্রেক, টায়ার বা অন্যান্য যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। যদিও নিয়ম অনুযায়ী যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা বাধ্যতামূলক, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় না।
সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পথচারীদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাফিক নিয়ম সম্পর্কে অজ্ঞতা বা অসচেতনতার কারণে অনেক পথচারী নির্ধারিত স্থান ব্যবহার না করে রাস্তা পারাপার করেন। একইভাবে মোটরসাইকেল আরোহীদের মধ্যে হেলমেট ব্যবহার না করা, তিনজন বা তার বেশি যাত্রী বহন করা এবং ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করার প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন। চালকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে কোনো ধরনের শিথিলতা না দেখিয়ে কার্যকর নজরদারি জোরদার করতে হবে।
সড়কে প্রতিটি মৃত্যু একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয় এবং সমাজের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির সৃষ্টি করে। তাই সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে সরকার, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ জনগণ—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা এখন শুধু একটি দাবি নয়, বরং একটি জাতীয় প্রয়োজন।

আপনার মতামত লিখুন