ডেইলি বাংল সংবাদ
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

কাল উঠছে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা, নতুন আশায় বুক বাঁধছেন মনপুরাসহ ভোলার উপকূলের জেলেরা

কাল উঠছে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা, নতুন আশায় বুক বাঁধছেন মনপুরাসহ ভোলার উপকূলের জেলেরা

কাল উঠছে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা, নতুন আশায় বুক বাঁধছেন মনপুরাসহ ভোলার উপকূলের জেলেরা

মুহাঃ আশরাফুল ইসলাম,মনপুরা উপজেলা প্রতিনিধি:- দীর্ঘ ৫৮ দিনের অপেক্ষার অবসান ঘটছে আগামীকাল ১১ জুন। সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ, মাছের নিরাপদ প্রজনন এবং টেকসই আহরণ নিশ্চিত করতে সরকার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় নতুন আশায় বুক বাঁধছেন মনপুরাসহ ভোলা জেলার হাজার হাজার জেলে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গে আবারও সাগরে ছুটবেন তারা, আর সেই প্রত্যাশায় এখন উপকূলের প্রতিটি মৎস্যঘাটে চলছে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা।

ভোলা জেলার প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৭১ হাজার জেলে বিভিন্নভাবে মৎস্য আহরণের সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৬৪ থেকে ৬৫ হাজার জেলে সরাসরি সাগরগামী এবং ইলিশ অভয়াশ্রম এলাকার মাছ শিকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। দীর্ঘ দুই মাস মাছ ধরতে না পারায় অনেক জেলে পরিবারকে চরম আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন পার করতে হয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার খবরে তাদের মাঝে ফিরেছে নতুন উদ্দীপনা।

মনপুরার বিভিন্ন মৎস্যঘাট ঘুরে দেখা গেছে, সারি সারি ট্রলার নোঙর করে রাখা হয়েছে ঘাটে। কোথাও জাল মেরামত, কোথাও নতুন জাল বোনা, আবার কোথাও ট্রলারের রং ও ইঞ্জিন সংস্কারের কাজ চলছে। জেলেরা ব্যস্ত সময় পার করছেন সাগরে যাত্রার প্রস্তুতি নিয়ে। যে ঘাটগুলোতে প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু হতো লাখ লাখ টাকার মাছ বেচাকেনা, সেখানে এখনও বিরাজ করছে নীরবতা। তবে সেই নীরবতার মাঝেও স্পষ্ট ভবিষ্যৎ স্বপ্নের ব্যস্ততা।

সমুদ্রগামী জেলে নোমান মাঝি বলেন, "সরকারের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা শেষ হতে যাচ্ছে। আমরা সবাই সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আশা করি এবার ভালো মাছ পাব। দুই মাসে অনেক দেনা হয়েছে। মাছ বিক্রি করে সেই দেনা পরিশোধ করতে চাই। গত বছর কিছুটা ভালো মাছ পেয়েছিলাম, এ বছরও আল্লাহ ভরসা।"

আরেক জেলে মহিউদ্দিন মাঝি বলেন, "নিষেধাজ্ঞার সময় পরিবার নিয়ে অনেক কষ্ট করেছি। ধার-দেনা করে সংসার চালাতে হয়েছে। এখন সাগরে গিয়ে মাছ পেলে ঋণ শোধ করতে পারব। কিন্তু মাছ না পেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে যাবে।"

জেলেদের অনেকেই জানান, গত দুই মাসে সংসার চালাতে তাদেরকে মহাজন, আত্মীয়-স্বজন কিংবা এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। এখন সেই ঋণ পরিশোধের একমাত্র ভরসা সাগরে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া। তবে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি তাদের নতুন করে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। কারণ ট্রলার পরিচালনার ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে।

মনপুরার জনতা বাজার এলাকার সমুদ্রগামী ট্রলার আড়তদার সিরাজ পালোয়ান বলেন, "আমাদের ট্রলার মেরামতের কাজ শেষ। জেলেরা সাগরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু গত বছর নিষেধাজ্ঞা শেষে আশানুরূপ মাছ পাওয়া যায়নি। এ বছরও যদি একই অবস্থা হয়, তাহলে আমরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ব। একটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে বর্তমানে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। ইতোমধ্যে আমার তিনটি ট্রলারের মধ্যে দুটি বিক্রি করতে হয়েছে।"

তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, "সাগরে টলিং জাহাজের কারণে জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব জাহাজ অনেক সময় জেলেদের জাল নষ্ট করে দেয় এবং মাছের রেণু-পোনা ধ্বংস করে। বিষয়টি কার্যকরভাবে তদারকি করা প্রয়োজন।

এদিকে স্থানীয় অনেক জেলে অভিযোগ করেন, শুধুমাত্র নিবন্ধিত জেলেরা সরকারি খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তা পান। অথচ অনেক প্রকৃত জেলে এখনও নিবন্ধনের বাইরে রয়েছেন। তারা নতুন করে জেলে নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন, যাতে সবাই সরকারি সুবিধার আওতায় আসতে পারেন।

মনপুরা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন,"সারা দেশের মতো মনপুরা উপজেলার জেলেরাও ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে মাছ ধরতে যাবে। ইতোমধ্যে তারা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। আমরা আশা করছি, নিষেধাজ্ঞার সুফল হিসেবে এবার সাগরে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যাবে এবং জেলেরা আর্থিকভাবে লাভবান হবে।"

উল্লেখ্য, মাছের নিরাপদ প্রজনন ও সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যে সরকার গত ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত দেশের সমুদ্রসীমায় সব ধরনের মাছ ধরার ওপর ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এ বছর পার্শ্ববর্তী ভারতের সঙ্গে সময় সমন্বয় করে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করায় জেলে ও মৎস্যসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এবার সাগরে মাছের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।

এখন উপকূলজুড়ে একটাই প্রত্যাশা—সাগর যেন ভরে ওঠে মাছের প্রাচুর্যে, আর দীর্ঘদিনের কষ্ট, ঋণ ও অনিশ্চয়তা কাটিয়ে আবারও স্বস্তির হাসি ফিরে আসে জেলে পরিবারের মুখে।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
ডেইলি বাংল সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬


কাল উঠছে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা, নতুন আশায় বুক বাঁধছেন মনপুরাসহ ভোলার উপকূলের জেলেরা

প্রকাশের তারিখ : ১১ জুন ২০২৬

featured Image

কাল উঠছে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা, নতুন আশায় বুক বাঁধছেন মনপুরাসহ ভোলার উপকূলের জেলেরা

মুহাঃ আশরাফুল ইসলাম,মনপুরা উপজেলা প্রতিনিধি:- দীর্ঘ ৫৮ দিনের অপেক্ষার অবসান ঘটছে আগামীকাল ১১ জুন। সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ, মাছের নিরাপদ প্রজনন এবং টেকসই আহরণ নিশ্চিত করতে সরকার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় নতুন আশায় বুক বাঁধছেন মনপুরাসহ ভোলা জেলার হাজার হাজার জেলে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গে আবারও সাগরে ছুটবেন তারা, আর সেই প্রত্যাশায় এখন উপকূলের প্রতিটি মৎস্যঘাটে চলছে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা।

ভোলা জেলার প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৭১ হাজার জেলে বিভিন্নভাবে মৎস্য আহরণের সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৬৪ থেকে ৬৫ হাজার জেলে সরাসরি সাগরগামী এবং ইলিশ অভয়াশ্রম এলাকার মাছ শিকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। দীর্ঘ দুই মাস মাছ ধরতে না পারায় অনেক জেলে পরিবারকে চরম আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন পার করতে হয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার খবরে তাদের মাঝে ফিরেছে নতুন উদ্দীপনা।

মনপুরার বিভিন্ন মৎস্যঘাট ঘুরে দেখা গেছে, সারি সারি ট্রলার নোঙর করে রাখা হয়েছে ঘাটে। কোথাও জাল মেরামত, কোথাও নতুন জাল বোনা, আবার কোথাও ট্রলারের রং ও ইঞ্জিন সংস্কারের কাজ চলছে। জেলেরা ব্যস্ত সময় পার করছেন সাগরে যাত্রার প্রস্তুতি নিয়ে। যে ঘাটগুলোতে প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু হতো লাখ লাখ টাকার মাছ বেচাকেনা, সেখানে এখনও বিরাজ করছে নীরবতা। তবে সেই নীরবতার মাঝেও স্পষ্ট ভবিষ্যৎ স্বপ্নের ব্যস্ততা।

সমুদ্রগামী জেলে নোমান মাঝি বলেন, "সরকারের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা শেষ হতে যাচ্ছে। আমরা সবাই সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আশা করি এবার ভালো মাছ পাব। দুই মাসে অনেক দেনা হয়েছে। মাছ বিক্রি করে সেই দেনা পরিশোধ করতে চাই। গত বছর কিছুটা ভালো মাছ পেয়েছিলাম, এ বছরও আল্লাহ ভরসা।"

আরেক জেলে মহিউদ্দিন মাঝি বলেন, "নিষেধাজ্ঞার সময় পরিবার নিয়ে অনেক কষ্ট করেছি। ধার-দেনা করে সংসার চালাতে হয়েছে। এখন সাগরে গিয়ে মাছ পেলে ঋণ শোধ করতে পারব। কিন্তু মাছ না পেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে যাবে।"

জেলেদের অনেকেই জানান, গত দুই মাসে সংসার চালাতে তাদেরকে মহাজন, আত্মীয়-স্বজন কিংবা এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। এখন সেই ঋণ পরিশোধের একমাত্র ভরসা সাগরে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া। তবে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি তাদের নতুন করে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। কারণ ট্রলার পরিচালনার ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে।

মনপুরার জনতা বাজার এলাকার সমুদ্রগামী ট্রলার আড়তদার সিরাজ পালোয়ান বলেন, "আমাদের ট্রলার মেরামতের কাজ শেষ। জেলেরা সাগরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু গত বছর নিষেধাজ্ঞা শেষে আশানুরূপ মাছ পাওয়া যায়নি। এ বছরও যদি একই অবস্থা হয়, তাহলে আমরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ব। একটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে বর্তমানে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। ইতোমধ্যে আমার তিনটি ট্রলারের মধ্যে দুটি বিক্রি করতে হয়েছে।"

তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, "সাগরে টলিং জাহাজের কারণে জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব জাহাজ অনেক সময় জেলেদের জাল নষ্ট করে দেয় এবং মাছের রেণু-পোনা ধ্বংস করে। বিষয়টি কার্যকরভাবে তদারকি করা প্রয়োজন।

এদিকে স্থানীয় অনেক জেলে অভিযোগ করেন, শুধুমাত্র নিবন্ধিত জেলেরা সরকারি খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তা পান। অথচ অনেক প্রকৃত জেলে এখনও নিবন্ধনের বাইরে রয়েছেন। তারা নতুন করে জেলে নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন, যাতে সবাই সরকারি সুবিধার আওতায় আসতে পারেন।

মনপুরা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন,"সারা দেশের মতো মনপুরা উপজেলার জেলেরাও ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে মাছ ধরতে যাবে। ইতোমধ্যে তারা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। আমরা আশা করছি, নিষেধাজ্ঞার সুফল হিসেবে এবার সাগরে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যাবে এবং জেলেরা আর্থিকভাবে লাভবান হবে।"

উল্লেখ্য, মাছের নিরাপদ প্রজনন ও সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যে সরকার গত ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত দেশের সমুদ্রসীমায় সব ধরনের মাছ ধরার ওপর ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এ বছর পার্শ্ববর্তী ভারতের সঙ্গে সময় সমন্বয় করে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করায় জেলে ও মৎস্যসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এবার সাগরে মাছের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।

এখন উপকূলজুড়ে একটাই প্রত্যাশা—সাগর যেন ভরে ওঠে মাছের প্রাচুর্যে, আর দীর্ঘদিনের কষ্ট, ঋণ ও অনিশ্চয়তা কাটিয়ে আবারও স্বস্তির হাসি ফিরে আসে জেলে পরিবারের মুখে।


ডেইলি বাংল সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ মনিরুল ইসলাম । নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ মাহবুব হাসান পাটোয়ারী


কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ডেইলি সংবাদ